cropped-cropped-rashedarawnakkhan-1.jpg

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সখী ভালোবাসা করে কয়, একি কেবলি যাতনাময়? রবীন্দ্রনাথ যে অর্থে এই গান লিখে গেছেন, সেই অর্থে আজকাল ভালোবাসা সংজ্ঞায়িত হয় কিনা, এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে! তবে আজকাল আমরা এমন একটা অস্থির সময় পার করছি যে, ভালোবাসার সঙ্গে-সঙ্গে উদ্বেগ, সতর্কতা, নিরাপত্তা, ঘৃণা, এমনকি কোপা-কোপি নিয়েও ভাবতে হচ্ছে! ভালোবাসলে উজাড় করেই তো ভালোবাসবে মানুষ!  ভালোবাসা প্রকাশে প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। মাশরাফিকে যখন এক বুক ভালোবাসা নিয়ে কোনও অন্ধপ্রেমিক দৌড়ে এসে ছুঁয়ে দেখতে চায়, জড়িয়ে ধরে তার সমস্ত অনুভূতি দিয়ে, তখন আমরা ভালোবাসাহীন মানুষজন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করি!
যাইহোক, নার্গিসকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল। কিন্তু ছাত্রলীগও দ্রুত দাবি করেছে যে, ‘চাপাতি বদরুল’ ছাত্রলীগের নয়! প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের কি আগে এই ঘটনার বিচার দাবি করা উচিত নাকি দলীয় পরিচয় কী—তা নির্ধারণ করার পেছনে মেধা, শ্রম, মনোযোগ সব দেওয়া উচিত? অপরাধীর দলীয় পরিচয় খুঁজতে গিয়ে আমরা যে অপরাধীর অপরাধকে হারিয়ে ফেলছি, তা তো বহুবার দেখলাম! আর কত? আফসানার মৃত্যু নিয়ে আমরা তো বটেই আফসানা যে দল করত, তারা কোথায়? দেশের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীর মৃত্যুর বিkhadijaচারে কতটা আন্দোলনে সফল? কেবল হত্যাকারী ‘ছাত্রলীগের’  নেতা এই বলেই আমরা আমাদের দায়িত্ব শেষ করে ফেলছি! কিন্তু দায়িত্ব তো থাকার কথা বিচার সুনিশ্চিত করা পর্যন্ত!
কিছুদিন আগে রিশাকে মেরে ফেলেছিল এক দর্জি। সে ছাত্রলীগের নয়, তারপরও মেরে ফেলেছে সবার চোখের সামনে রিশার স্কুলের কয়েক গজের মধ্যেই। কোনও দলের দ্বারা ক্ষমতাবান না হয়েও একইরকম দুর্বৃত্তপনা করেছে এমন হাজারও উদাহরণ আছে সমাজে। 

অতএব এখানে দুর্বৃত্তপনার সঙ্গে ব্যক্তি মানুষের ‘ক্ষমতা’র সম্পর্ক যতটা জোরালো, দলীয় পরিচয়ের সঙ্গে ঠিক ততটা নয়, অন্তত এই ঘটনাটির ক্ষেত্রে! এতকাল ভালোবাসায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে যেসব বখাটে এসিড ছুড়ে দিয়েছে, তারা ‘ক্ষমতাবান’, কিন্তু সেই ‘ক্ষমতা’ সবসময় ছাত্রদল বা ছাত্রলীগের কাছ থেকে তারা পেয়েছে, তা বলা যাবে না। ঘটনা ঘটার সঙ্গে-সঙ্গে গণমাধ্যমের কল্যাণে এইসব অপরাধীর পরিচয় মেলে কোন দলের, কোন পদের! আর অপরাধী যদি ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের এর হয়, কেন্দ্রীয় কমিটিগুলো আর্তনাদ করতে শুরু করে এই বলে যে, ‘এই অপরাধী আমাদের দলের নয়!’ এটা আজ প্রথম হচ্ছে, তা নয়! এই মুহূর্তে বদরুলের ক্ষেত্রে যা ঘটছে, তা বহুবার হয়েছে বিভিন্ন সরকারের সময়ে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, গণমাধ্যম এবং ছাত্র সংগঠনের  মধ্যকার ‘পরিচয় নির্মাণের’ বিতর্কে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ‘নারী নির্যাতন’-এর যে রাজনীতি, তা আড়ালে চলে যায়! তাতে মূল অপরাধী বেঁচে যায়, হেরে যাই আমরা!

ছাত্রলীগ একটি বড় ছাত্র সংগঠন। তাদের কাছে প্রত্যাশা বেশি থাকাটাই স্বাভাবিক। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ‘বদরুল ছাত্রলীগের নয়’—এটা না বলে যদি বলতো, ‘অপরাধী যে দলেরই হোক, বিশেষ করে আমাদের দলের হলেও শাস্তি তাকে পেতেই হবে’। তাহলে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে দল হিসেবে তাদের অবস্থান আরও অনেক জোরালো হতো। সেই শক্তি, সেই মানসিক দৃঢ়তা কেন নেই এত বড় একটা দলের, তা আমাদের ভাবায়। এই দল তো অন্য যেকোনও দলের মতো নয়! তাদের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস! বাংলাদেশের ইতিহাস লিখলে বেশিরভাগ পাতা দখল করে নেবে এই দল, যারা ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণআন্দোলন, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল।  যদিও বর্তমান সময়ের ছাত্রলীগ তাদের সেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছে নানা কারণেই!

যেমন, হলি আর্টিজানের ঘটনার কিছুদিন পর আমরা দেখি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্ৰুপ পরস্পর মারামারি করে লাশ ফেলে দেয় নিজেদের! এটা অন্তত ছাত্রলীগের মতো এত বড় একটা দল হতে আশা করা যায় না। তাহলে, প্রশ্ন ওঠে কারা এখন ছাত্রলীগে নাম লিখাচ্ছে? অন্যদল হতে এখানে নাম লিখিয়ে ফেলছে কিনা, ছাত্রলীগ এই যুগে ‘হাইব্রিড নেতা’ তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে কিনা! এসব বিবেচনা করে ছাত্রলীগের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে এখন দ্রুত সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদেরই।

এই ক্ষেত্রে সরাসরি দলের পরিচয়ে কিংবা দলের শক্তিকে কাজ লাগিয়ে এই ‘চাপাতি বদরুল’ অপরাধ করেনি, তাহলে তার হাতে অস্ত্র থাকতো, কিংবা তার সঙ্গে দলের সঙ্গী-সাথীরা থাকতো। তার মানে সে যা করেছে, একান্তই ব্যক্তিগত জায়গা থেকেই করেছে। অতএব এখন দলের পরিচয় প্রকাশিত হওয়ায় কেন্দ্রীয় কমিটির কাজ হচ্ছে, তার বিচার যেন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়, সেদিকে নজর রাখা! কেউ যেন দলের পরিচয় দিয়ে অপরাধ করেও মুক্তি না পেতে পারে, সেদিকে লক্ষ রাখা। কিন্তু তা না করে ‘অপরাধী বদরুল ছাত্রলীগের নয়’ এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি আসলে তাদের আরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে জনগণ থেকে। আমরা ভালোভাবেই জানি, ছাত্রলীগ বা যেকোনও দল তাকে বলে নাই, এভাবে একটি মেয়ের ওপর কোপের পর কোপ দিয়ে মেরে ফেলতে। কিন্তু এটাও সত্যি দল থেকে বড় কোনও অপরাধ করে বেঁচে যাওয়া নেতার উদাহরণ হয়তো তাকে নীরবে সাহস জুগিয়েছে এই ধরনের জঘন্য কাজ করতে! তাই দলের ভূমিকা হবে, এই ধরনের আর কোনও উদাহরণ যেন দলে স্থান না পায় সেদিকে লক্ষ রাখা। বড় দল হিসেবে তাদের দায়িত্বও অনেক বড়, এটা ভুলে গেলে চলবে না। আগে এই ধরনের কিছু ঘটলে ছাত্র রাজনীতির মূল জায়গা ছিল, অপরাধীর বিচার চেয়ে লড়াই করা। আর এখন অপরাধীর দলীয় পরিচয় নির্মাণ-বিনির্মাণের রাজনীতি করেই দায়িত্ব শেষ করছে ছাত্র সংগঠনগুলো।

যাক এবার একটু ভিন্নভাবে দেখি! দলীয় ক্ষমতার বাইরে ব্যক্তি বদরুল যে ‘ক্ষমতাবলে’ অপরাধ করে, তা কি একান্তই তার নিজস্ব কিংবা সে যে দল করে সেই দলের? এই প্রশ্ন কিন্তু হারিয়ে যায় এই পরিচিতি নির্মাণের রাজনীতির আড়ালে! এই ‘ক্ষমতা’ মূলত পশুত্বের ক্ষমতা! পিতৃতান্ত্রিক সমাজে একজন ছেলেকে জন্ম থেকে শেখানো হচ্ছে, এই সমাজ তার, এই সমাজের নারী তার, সে যে নারী চাইবে, সেই নারীকেই পাবে, সে নারীকে বিয়ে করবে, সেই নারী তার আদেশ পালন করবে, এর বাইরে একজন নারীর কোনও নিজস্বতা বলে কিছু নাই। নার্গিসের হয়তো বদরুলের প্রতি ভালোবাসা একসময় ছিল, এখন তা আর অবশিষ্ট নেই, হতেই পারে! এটা ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপার, ব্যক্তি স্বাধীনতা। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কিছু পুরুষ ধরেই নেয়, নারী ‘না’ বলতে পারবে না!  ‘না’ বললেই সেই নারীকে শেষ করে দিতে হবে। তার কাছে ‘ভালোবাসা’ মানে জোর-জবরদস্তি, হাত-হাতি-মারা-মারি-শেষ পর্যন্ত মেয়েটি তার অবাধ্য হলে মেরে ফেলা! সমাজের এই একটা বিশাল অজ্ঞ অংশকে কে শেখাবে ‘ভালোবাসা’র প্রকৃত অর্থ? ‘ভালোবাসা’ যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সম্পর্কের ভিত্তিতে হয়, ভালোবাসাকে যে প্রতিনিয়ত পরিচর্যা করতে হয়, তা তাদের কানে কে পৌঁছাবে? আমরা যদি শেখাতে চাই, তবে তো আমাদের আগে নিজেদের শোধরাতে হবে, নারী-পুরুষের সম্পর্ককে অনেক সহজভাবে দেখার অভ্যাস করতে হবে। আমরা নিজেরাই কতটা এই লিঙ্গের সম্পর্ককে শ্রদ্ধার সঙ্গে ভালোবাসতে শিখেছি?

আবারো ফিরে আসি মাশরাফি ভক্তের ভালোবাসা প্রসঙ্গে, তবে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। আচ্ছা, এমন যদি হতো মাশরাফির এই ভক্তটি একজন নারী! ১৬ কোটি মানুষের মাঝে হাতেগোনা ক’জনকে পাওয়া যেত, যারা মাশরাফির প্রতি ভক্তের এই ভালোবাসাকে একদম স্বাভাবিকভাবে নিত? তখন আলোচনা কোন দিকে যেত? নিজেকে প্রশ্ন করি, আমরা শহুরে ‘শিক্ষিত’ ‘উচ্চবিত্ত’ ‘মধ্যবিত্ত’ মানুষজনের মাঝে কতজন নিজেকে এই নারী-পুরুষ আলোচনা থেকে দূরে থাকতাম? মাশরাফি কি পারতেন মেয়েটিকে এভাবে নিরাপদে আগলে রাখতে? কেন পারতেন না? পারলে তো ‘খবর’ই ছিল! কিন্তু এই ‘খবর’ অন্তত মাশরাফি কিংবা তার ভক্তের  লৈঙ্গিক দিককে ইঙ্গিত করে প্রকাশিত হচ্ছে না, কিন্তু তখন খুব নগ্নভাবেই প্রকাশিত হতো! মাশরাফিকে নিয়ে এতক্ষণে কয়েক ডজন উপন্যাস রচনা হতো! হলুদ সাংবাদিকতা ছড়িয়ে দিতো বাতাসে হলুদ রঙ! ওই কল্পিত মেয়েটির ‘চরিত্র’ বলে কিছু থাকতোই না ! উচ্ছন্নে যাওয়া, বখে যাওয়া, লাজ-লজ্জাহীন মেয়ে হিসেবে তার কপালে জুটতো নানা রঙের পরিচয়! সেই পরিচয় নিয়ে তার তো বটেই, তার পরিবারের মানুষজনও সমাজে একঘরে হয়ে যেত! আমাদের দেশে একজন ছেলে ভক্তের ভালোবাসা প্রকাশের অধিকার থাকলেও মেয়ে ভক্তের থাকা যাবে না! কিন্তু আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, মাশরাফির ছেলে ভক্তের চেয়ে মেয়ে ভক্তের সংখ্যা কোনও অংশে কম নয়! আমরা ভালোবাসাকে কতটা ছাঁচে ফেলে দিচ্ছি এই শতাব্দীতে এসেও ভাবলে অবাক লাগে! নারী-পুরুষের সম্পর্ককে এখনও আমরা কিভাবে যেন জটিল করে দেখি! আর এই জটিলতার জটিলতর রূপ প্রকাশ পাচ্ছে সমাজের বিভিন্ন মানুষের কাছে বিভিন্নভাবে, কখনো তা ভয়ঙ্কররূপে!

শেষ করছি, নিজের কাঁধে দোষ চাপিয়ে! ছোটবেলায় যখন মায়ের মুখে প্রথম বঙ্গবন্ধু’র ‘৭৫ এর ১৫ আগস্টের গল্প শুনছিলাম, তখন হঠাৎ প্রশ্ন করেছিলাম, মা উনি এত বড় নেতা, তাকে শত্রুরা মেরে ফেললো কিভাবে? কেউ তাকে বাঁচাতে আসেনি? উত্তরে মা কী বলেছিলেন ঠিক মনে নেই। কিন্তু এতটুকু খুব মনে আছে, তিনি বলেছিলেন, বঙ্গুবন্ধু অনেক উদার মনের মানুষ ছিলেন, মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হতেই তিনি বেশি আনন্দিত হতেন। তিনি তার জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে মানুষের ভালোবাসাকে মূল্য দিতেন বেশি, মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতেন। মানুষকে ভালোবাসার মূল্য তাকে এভাবে এতটা নৃশংসভাবে দিতে হবে, তা হয়তো তিনি কল্পনাও করেননি! সেদিনও পারিনি, আজও পারলাম না! এত বছরেও আমাদের সাহস সঞ্চয় হয়নি এতটুকু!  যখন দিনে-দুপুরে একটা লোক চাপাতি দিয়ে কোপাচ্ছে একটি মেয়েকে, কেউই কি এগিয়ে আসতে পারলো না! কী বিচিত্র আমরা! কেউ কেউ ভিডিও করেছেন, তা আপলোড করায় ব্যস্ত ছিলেন। একটু হলেও কি বাঁচানো যেত না মেয়েটিকে এই ধরনের পাশবিক নির্যাতন থেকে? তবে ইমরান কবিরের  প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই শেষ পর্যন্ত খাদিজাকে হাসপাতালে এনে ভর্তি করানোর জন্য !

মজার ব্যাপার হলো, আমরা নিজেরা এসব ক্ষেত্রে নীরব দর্শক হয়ে থাকলেও মাশরাফির ‘হিরোইজম’কে পছন্দ করি, ইমরান কবিরকে বাহবা দেই, আবেগে প্লাবিত হই কিন্তু ব্যক্তি আমি ‘হিরো’ হতে জানি না! যারা সেদিন এই দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি, আমাদের কারও জীবনই তো মাশরাফির চেয়ে মূল্যবান নয়! মাশরাফি তার অতি মূল্যবান জীবনের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য না দিয়ে যদি একটা অচেনা ভক্তকে রক্ষা করতে পারেন, সেই দেশেই আমরা অতি সাধারণ হয়েও একটি মেয়েকে বাঁচাতে পারলাম না?  আসুন না, প্রতিটি মানুষই নায়ক হয়ে ওঠি, বদলে দেই নিজের ভীতু পরিচয়টিকে, এত বছরের গ্লানি থেকে মুক্ত হই, বদলে দেই নিজের দেশকে!

logo_bati

পূর্বে প্রকাশিত

Sharing