জঙ্গিবাদ দমন সহজ কাজ নয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশের অপরাধ বিশেষজ্ঞ, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাংবাদিকরা। তারা বলেন, এটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। দেশে এখন যে পরিস্থিতি, এটা একটা যুদ্ধ, এ যুদ্ধে জিততে হবে। শনিবার বিকেলে বাংলা ট্রিবিউন আয়োজিত ‘জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি’শীর্ষক বিশেষ বৈঠকিতে তারা এসব কথা বলেন।

 

বৈঠকিতে বক্তারা বলেন, ভেবে দেখার সময় এসেছে কী কী উপাদান সমাজে বিদ্যমান আছে, যে কারণে জঙ্গিবাদ ছড়াতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বক্তারা বলেন, এখন সবকিছুই ধারণার ওপর নির্ভর করে হচ্ছে। এজন্য বিস্তর গবেষণা জরুরি।

বাংলা ট্রিবিউন কার্যালয়ে আয়োজিত বৈঠকিতে বক্তারা চলমান জঙ্গি হামলা ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলাচনার পাশাপাশি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সম্ভাব্য প্রক্রিয়াগুলোর নিয়ে আলোচনা করেন।

মনিরুল ইসলাম

 

মিথিলা ফারজানার সঞ্চালনায় বৈঠকিতে অংশ নিয়ে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, এ কাজটা করতে গিয়ে আমরা আগে খুব বেশি সহায়তা পাইনি। কিন্তু ১ জুলাইয়ের পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে অনেকটা। আলেম সমাজ ও সরকার মিলে এখন যে সমর্থন দিচ্ছে, সেটা নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই। এটা এক যুদ্ধ, এ যুদ্ধে জিততে হবে।

ব্রি. জে. (অব.) হাবিবুর রহমান

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রি. জে. (অব.) হাবিবুর রহমান বলেন, আমরা ‘ক্যালকুলেটেড রিস্ক’ নিয়ে অপারেশন অপারেট করি। সক্ষমতা অর্জন সম্ভব কিনা, এটা একটা ধারাবাহিক ইঁদুরবিড়াল দৌড়। মনে রাখা জরুরি, আমরা যত বেশি সক্ষম হব, জঙ্গিরা নতুন ডাইমেনশনে নিয়ে আরও শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসতে চাইবে। ফলে ওরা যেটা করবে, সেটাকেই কাউন্টার করার প্রস্তুতি থাকতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সবসময় ওরা কী করতে পারে, সেই সম্ভাবনা চিহ্নিত করে আগেই প্রস্তুত থাকাটাই মূল কাজ। যেন সামনে আসার পরিস্থিতি তৈরি হলেই গ্রেফতার করতে পারি।

 

জুলফিকার রাসেল

বাংলা ট্রিবিউনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জুলফিকার রাসেল আইনশৃঙ্খলার ক্ষাকারীবাহিনীর প্রতিনিধির কাছে জানতে চেয়ে বলেন, বিভিন্ন সময় আমরা দেখি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানো হয়। যেগুলোর বেশিরভাগই প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আপনারা কখনও মনিটর করেছেন কিনা এটা কারা করেছে, অর্থ কোথা থেকে এসেছে। কেননা আমরা জানি প্রশাসনের ভেতরও ভূত আছে। চেকপোস্টে কারা চেক না করে ছেড়ে দিচ্ছে, এসব নিয়ে কি কখনও খোঁজখবর রাখা হয়। আর যেকোনও ঘটনা ঘটার ক্ষেত্রে যদি আপনাদের কাছে তথ্য থেকেই থাকে, তাহলে আপনারা সেটা জানান না কেন। এটাকে ব্যর্থতা মনে করেন কিনা।

জবাবে হাবিবুর রহমান বলেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জায়গায় কিছু সমস্যা আছে। প্রশাসনিক জটিলতা আছে। মনে রাখবেন ’৭১-এ স্বাধীন করার ইস্যু নিয়ে সামনে এসেছিল জনতা, সেখানেও শান্তিবাহিনী রাজাকার তৈরি হয়েছিল। ফলে বিশাল মানুষ ধর্মাবলম্বী আছে, এ মানুষগুলো ঢুকে গেছে।

জায়েদুল আহসান পিন্টু

সাংবাদিক জায়েদুল আহসান পিন্টু বলেন, আমাদের প্রশ্ন একই জঙ্গিকে কেন একাধিকবার ধরতে হয়? ২০০১ সালে হিযবুত তাহরীর প্রতিষ্ঠার পর তা নিষিদ্ধ করতে কেন নয়বছর সময় লাগলো? কে বলছে নতুন করে বিত্তবানদের ঘরে প্রবেশ করছে হিজবুত তাহরীর? তিনি গবেষণা দরকার উল্লেখ করে বলেন, মনোজগতে আঘাত দরকার এখন যেন দেশের ছেলেমেয়ের মনোজগতে এই জঙ্গিবাদ না ঢুকে যায়। সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠন করুন। ধর্মীয় মৌলবাদ ঢুকিয়ে দিয়ে কালকেই জঙ্গিবাদ দমন হয়ে যাবে ভাবলে ভুল হবে।

 আরিফ জেবতিক

ব্লগার ও লেখক আরিফ জেবতিক বলেন, এখন আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন আছে। ২০০৬ সালে আইসিটি অ্যাক্ট হওয়ার পর থেকে জঙ্গিদের কতজনকে এই আইনে ধরেছেন আর উল্টোদিকে কতজন ব্লগারকে ধরেছেন, এসব হিসাবে যেতে হবে। আমরা বলছি, যখন কিনা জঙ্গিদের অনলাইন ক্যাম্পেইন শক্তিশালী, তখন আপনাকে কনটেন্ট দিয়ে কনটেন্টকে মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু আপনি আমাকে সে সুযোগ দিচ্ছেন না। যে কনটেন্ট তৈরি করবে, তাকে তো হেনস্তা করা হচ্ছে, সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে।

ড. মেখলা সরকার

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. মেখলা সরকার মনে করেন এখন পর্যন্ত যা কিছু আলাপ এগুচ্ছে, তা এক ধরনের  ধারণা থেকে হচ্ছে। যৌক্তিক জায়গায় যেতে চাইলে গবেষণাকেন্দ্র করা দরকার। এখন যেহেতু সামাজিক একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এর বীজ আছে কিনা, আমরা জানি না। ফলে সঠিক ও যৌক্তিকভাবে কিছু করতে চাইলে গবেষণা করা জরুরি।

রাশেদা রওনক খান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান বলেন, আমাদের দাঁড়ানোর কোনও কমন প্ল্যাটফর্ম নেই। গণমাধ্যম এখন কমন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সামনে এসেছে। সন্তান যেন বিপথে না যায়, সেজন্য বাবামায়ের বড় ভূমিকার কথা বলি। কিন্তু স্কুলে নিয়ে এক ক্লাস এগিয়ে বয়স কমিয়ে যখন সন্তানকে বড় করছি তখন ভাবি না, সে আমার কাছ থেকে কী শিখছে? এখানে আমরা ভালো দিকগুলো যেমন বলছি, খারাপ দিকগুলোও বলতে হবে। অসসতার জায়গা থেকে বের হতে হবে। আমরা বাবারা কী করছি, সেটা সন্তান লক্ষ্য করছে। সেটা মনে রাখা দরকার.

তানভীর হাসান জোহা

সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন,  এলাকাভিত্তিক জঙ্গিরা যে মিটিং করত, এখন সেটা তারা অনলাইনে করে ফেলছে। তারা এখন অ্যাপস ব্যবহার করে অনলাইনে কাজ সারছে অনায়াসেই। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় এসএসসির পর ধর্ম পড়া হয় না। ফলে অ্যাডফান্স লেভেলে কেউ ধর্ম নিয়ে কথা বললে আমরা জবাব দিতে পারি না। কনটেন্ট দিয়ে কনটেন্ট মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতি যেন থাকে, সেটা জরুরি।মিথিলা ফারজানা

মিথিলা ফারজানার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত বৈঠকিটি একাত্তর টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। এছাড়া বৈঠকির প্রচার সহায়ক হিসেবে ছিল ঢাকা ট্রিবিউন।

ঢাকা ট্রিবিউন।

Sharing