cropped-cropped-rashedarawnakkhan-1.jpg

শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পার্বতীপুরে পাঁচ বছর বয়সী একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, মেয়েটির শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে জখম করে সাইফুল ও আফজাল নামের দুই ধর্ষক। আফজালকেও আমি ধর্ষকই বলবো কারণ ধর্ষকের সহায়ক একজন ধর্ষকই হবে। সাইফুল মেয়েটির প্রজনন অঙ্গ কেটে ধর্ষণ করে। পরদিন ভোরে বাড়ির পাশে একটি হলুদ ক্ষেত থেকে মেয়েটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। সাইফুল ইসলামকে গ্রেফতার করা গেলেও এখনও পলাতক আফজাল হোসেন।
শিশুটির প্রজনন অঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত অনেকটাই । তার এই অবস্থা দেখে খোদ ডাক্তাররাই হতবাক! শিশুটির সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ‘যদি সংক্রমণ রক্তে ছড়ায়, তাহলে বিষয়টি ভয়াবহ হবে। শিশুটির প্রজনন অঙ্গে দেখা দেওয়া সংক্রমণ রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ার (সেপটিসিমিয়া) আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা। এবং তার প্রজনন অঙ্গে অস্ত্রোপচার করতে দেড় থেকে দুই মাস অপেক্ষা করতে হবে’। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, শিশুটির জীবনহানির শংকা না থাকলেও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত রয়েছে। কী পাষণ্ড! কী ভয়ানক কথা! সারারাত ধরে একটি পাঁচ বছর বয়সী শিশুকে ৪ সন্তানের বাবা এভাবে এতটা ভয়ানকভাবে ধর্ষণ করতে পারে, নির্যাতন করতে পারে? পশুর চেয়েও এত ভয়ংকর প্রাণী আমাদের চারদিকে! শিশুটি তাকে ‘বড় আব্বা’ বলে ডাকতো। কোথায় গেলো মানুষের মানবিক মূল্যবোধ?

এই পাষণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন অনেকেই। আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই ধর্ষকের বিচার হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। অনেকেই কষ্টে মুষড়ে পড়ছেন, অনেকে এই ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে শুনে আশ্বস্ত হয়েছেন।

কিন্তু এতসব সত্যের মাঝেও একটা সত্য দৃশ্যমান হয়েছে, তা হলো অনেকেই শিশুটির নাম যখন দেখেছেন, পূজা, বাবা সুবল চন্দ্র সাহা, তখন ততটা বিচলিত হয়নি, যতটা হতেন যদি মেয়েটার নাম হতো পপি বা পারভীন। ‘ও আচ্ছা! হিন্দুর মেয়ে’ এই ধরনের উচ্চারণ কান পর্যন্ত ঠেকেছে ফেসবুকের কল্যাণে। এইসব যোগাযোগ মাধ্যম থাকায় আজকাল কিছু মানুষের মনোজগতকে পাঠ করা যাচ্ছে। ‘ধর্মের রাজনীতি’ আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিকে গ্রাস করে ফেলেছে এতটা নগ্নভাবে যে, মাঝে মাঝে লজ্জিত বোধ করি।

শ্রেণিভিত্তিক রাজনীতিও চোখে পড়ে যখন দেখি ধর্ষণের বিচার চেয়ে মামলা করায় রংপুরের মিঠাপুকুরে এক ছাত্রীকে বিদ্যালয় থেকে তাকে ছাড়পত্র দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। কেননা, ধর্ষক রাশেদুল ইসলাম বড়বালা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেব সরকারের ভাতিজা। উল্টো ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি লুৎফর রহমান বলেছেন, মেয়েটির চারিত্রিক সমস্যা থাকায় তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

হায়রে মানবতা, হায়রে সমাজ। তারাই নাকি ওই সমাজের নীতি-নির্ধারক।

যারা ধর্ষক এবং যারা ধর্ষককে রক্ষার জন্য এই ধরনের রাজনীতি করে, তারা সবাই আসলে ধর্ষকই কেননা, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সম দহে’ ! তাই সামাজিক মাধ্যমেও যারা এইসব ঘটনার মূল জায়গায় কথা না বলে, সারাক্ষণ ধর্ষকের ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কথা বলেন, তারা একভাবে তাদের বাঁচিয়ে দেওয়ার রাজনীতি করেন। কেউ কেউ বলছেন, সাইফুল ছাত্রদলের কর্মী! যেহেতু ছাত্রদল ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন নয়, তাই এই ব্যাপারে একটু হৈ চৈ কম হচ্ছে, লেখালেখিও নেই, আন্দোলন-সংগ্রাম তো দূরের কথা! সেদিন খাদিজাকে কুপিয়েছে ছাত্রলীগ কর্মী বদরুল, আজ পূজাকে যুবদলের নেতা, ওই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের যুবদল সভাপতি। কেউ কেউ ফেসবুক বন্ধুদের আশস্ত করছেন এই বলে যে, সাইফুল ছাত্রলীগের কেউ নয়। আবার বিএনপি’র নেতাকর্মীরা ফেসবুকে বদরুলের বেলায় এত হৈচৈ করলেও এবার যেন একদম নীরব! আমার ভাবনার জায়গা এই ধরনের রাজনীতিকে ঘিরে!

লক্ষ্য করছি, আমরা আজকাল ধর্ষকের বিচার চাওয়ার চেয়ে ধর্ষক এবং ভিকটিমকে চারিত্রিক সার্টিফিকেট দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তনুর সময় আমাদের সারাক্ষণ বলতে হয়েছিল যে, তনু খুব ‘ভদ্র’, ‘হিজাবি’ মেয়ে ছিল। এখনো বার বার বলতে হয়, তনু কিংবা খাদিজা তাদের বেপরোয়া চলাফেরার জন্য নয়, বরং ক্ষমতাবানদের লোভ-লালসা-রোষের শিকার! অন্যদিকে এখনও বিতর্ক শুনতে হয়, আফসানা তো রাজনীতি করতো, খুনি’র সঙ্গে তার প্রেম ছিল, তনু তো নাটক করতো, গান করতো, তনু কেমন ছিল, কেন এতরাতে টিউশনি করতে গেলো ইত্যাদি। যেন রাজনীতি করলে, নাটক করলে, গান গাইলে, প্রেম থাকলে কিংবা বিবাহিত হলে তাকে মারা জায়েজ! এসব রাজনৈতিক ডিসকোর্সের ভেতরে তাই আফসানা নিয়ে আমরা যেমন আন্দোলন করার শক্তি খুঁজে পেলাম না, তনু হত্যার কোনও হদিস মেলেনা! আজ পূজার বেলাতেও তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কথা বলতে একটুও পিছুপা হচ্ছে না কেউ কেউ। এত গেলো ভিকটিমের পরিচিতি নিয়ে রাজনীতি, যে রাজনীতির আড়ালে হারিয়ে যায় মানবিকতাবোধ।

এবার আসি ধর্ষক কিংবা খুনির পরিচিতি নির্মাণ প্রসঙ্গে। এইসব জানোয়ারদের বিচারের দাবিতে আমাদের যতটা সোচ্চার থাকার কথা ছিল বা উচিত ছিল, তার চেয়ে আমাদের সব উৎসাহ-উদ্দীপনা তাদের পরিচিতি নির্মাণ প্রসঙ্গে। সাইফুল কে, সে কোন দল করতো? বদরুল কে, সে কোন দল করতো? রিসা’র হত্যাকারী সেই দর্জি কোন দলের? এসব পরিচিতি নির্মাণের রাজনীতির আড়ালে হারিয়ে যায় বিচার চাওয়ার অধিকারবোধ ও প্রত্যয়, তা অনুধাবনের সময় কিন্তু এসেছে।

বদরুল ছাত্রলীগ করে কী, করে না- সেই প্রসঙ্গে বদরুলের পরিচিতি নির্মাণের সময়ও বলেছি, এখনো বলছি, ধর্ষকের কোনও রাজনৈতিক পরিচয় নেই! এই নিয়ে যারা কথা বলছে, তারা এসব বলার মধ্যদিয়ে আসলে ‘ধর্ষক’-‘নিপীড়ক’ এর পরিচিতিকে আড়াল করছে এবং কেউ কেউ সচেতন কিংবা অসচেতনভাবেই মূল সমস্যা আড়াল  করার জন্য এসব বলে বেড়ায়!  ধর্ষক কেবলই একজন জঘন্য নিপীড়ক, জানোয়ার- তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেওয়ার জন্য আইন করা হোক। সে কোন দলের, মতের, ধর্মের, শ্রেণির- তা মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় একটাই—সে যে দল, মত, বর্ণ-শ্রেণিরই হোক না কেন তার শাস্তি চাই। কিন্তু এসব দাবি না তুলে, যারা কেবল সারাক্ষণ ধর্ষকের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কথা বলে বেড়াচ্ছি, তারা কি কখনও একবারের জন্যও ভাবছি, আমরা আসলে কী বলছি? কেন বলছি? সমাজের সবচেয়ে হীন কীট নিয়ে রাজনীতি করছি কিনা? কাদের বাঁচাতে চাইছি? কাদের স্বার্থে এসব বলছি? কে লাভবান হচ্ছে? নাহ, একদল ভাবছি না আর আরেকদল—যারা ভেবেই বলছেন, তারা  মূলত ধর্ম-শ্রেণি-লিঙ্গ-দলের রাজনৈতিক শক্তির কাছে নতজানু হয়ে বলছেন ! যারা এই বিতর্ক করছে  তারা আসলে মানবতা, মানবিক মূল্যবোধ, মমত্ববোধ ভুলে গিয়ে ‘অতি রাজনৈতিক মনোভাবাপন্ন’ প্রাণীতে পরিণত হয়েছে!

এই ‘অতি রাজনৈতিক মনোভাব’ এর ভেতরে তারুণ্যের তেজ নেই, দীপ্ততা নেই, রাগ নেই, কষ্ট নেই, প্রতিবাদী চেতনা নেই, আছে কেবল কোনও না কোনও শক্তির পক্ষ হয়ে কথা বলে তর্কে বহুদূর যাওয়া, নেই নিজের ভাবনায়, আপন চেতনায় জ্বলে উঠবার আকাঙ্ক্ষা! আছে কেবল রাজনৈতিক ভাবে পক্ষ-বিপক্ষ নেওয়ার শক্তি, দলাদলি করার মনোভাব, সাইফুল-বদরুলকে নিয়ে রাজনীতির প্রেক্ষাপট তৈরির চিন্তা! কিন্তু যা থাকা দরকার ছিল আমাদের ভেতরে তা হলো- এই ধরনের ঘুনে ধরা রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করার মধ্যদিয়ে যেকোনও অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করা, প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আমরা নতজানু হচ্ছি রাজনৈতিক পরাশক্তির কাছে, নতজানু হচ্ছি বিভেদের রাজনীতির কাছে, প্রভাবিত হচ্ছি অপশক্তির দ্বারা অনায়াসেই। নিজেকে ভাবনার সময় দিচ্ছি না, বিবেককে জিজ্ঞাসা করছি না, সত্য জানতে চাইছি না। আমাদের আজ কোনও প্রশ্ন নেই, সবাই উত্তর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেসব উত্তর ব্যক্তির নিজের নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতি (যেমন ধর্মীয়, লিঙ্গীয়, দলীয়, শ্রেণীগত ) দ্বারা প্রভাবিত সেই সাজানো উত্তর! সত্য উৎঘাটনে যেখানে তারুণ্যের উচ্চারণে সবার ওপরে থাকার কথা মানবতাবোধ, সেখানে আজ দেখতে পাই রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি! এভাবে চলতে থাকলে একসময় পরাজয় হবে মানবতার, জয় হবে (অপ)রাজনীতির!

logo_bati

Published on 29-10-16

Sharing