লেখক: শিক্ষক, নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এক হালিতে পা দিচ্ছে, তিন বছর পেরিয়ে বাংলা ট্রিবিউন! অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। পাঠক হিসেবে বলতে পারি, জন্মলগ্ন থেকেই একটা মায়াবী জায়গা তৈরি করে নিয়েছে পত্রিকাটি। বাংলা ট্রিবিউনের একটি মূল আকর্ষণের জায়গা হলো, তারুণ্যের কণ্ঠস্বরকে বরাবরই একটু বেশি প্রাধান্য দেয়। আর দেবেই বা না কেন। যারা এই পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাই বয়সে তরুণ ও মেধাবী।
তারুণ্যের শক্তিতে ভরপুর এই পত্রিকাটি খুব অল্প সময়েই, মাত্র তিন বছরেই দখল করে নিয়েছে অগণিত পাঠক হৃদয়! সময়ের বিবেচনায় এই অবস্থানকে বিচার করলে আমি বলবো, ডিজিটাল দুনিয়ায় গণমাধ্যমের এই বৃহৎ পরিসরে, মাত্র  তিন বছরে এতটা পথ দৃপ্ত পায়ে হেঁটে চলা অনেক সাহস এবং শক্তির ব্যাপার। অভিনন্দন এমন সাহসী পথচলায় পাঠক এবং লেখক হিসেবে আমাদেরকেও সঙ্গী করে নেবার জন্য।
গণমাধ্যমের যে সাহসী উচ্চারণ তা থেকে সরে না আসার সংকল্পই পত্রিকাটিকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। উত্তরাধুনিক এই ডিজিটাল যুগে গণমাধ্যমের যে বিশাল ব্যাপকতা, সেখানে একটি অনলাইন পত্রিকার পাঠক চাহিদা তৈরি করা, সেই চাহিদার কার্ভটি নিয়মিতভাবে উপরের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সত্য ও সুন্দরের পথে হাঁটা খুব সহজ কাজ নয়। আর এই কঠিন কাজটি করতে বাংলা ট্রিবিউন এবং তার কাণ্ডারিরা দিনে দিনে যেভাবে নিজেদের তৈরি করছে, তা সত্যিই অনন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।

‘অনলাইন পত্রিকা’- এই পরিচিতিটা অনেক সহজ মনে হলেও আসলে এতো সহজ ও সরল ‘পরিচিতি’ নয়! কেননা, এই মুহূর্তের ডিজিটাল দুনিয়ায় অনলাইন বিষয়ক খবরাখবর দেওয়ার জন্য ‘ব্যক্তিমানুষ’ থেকে শুরু করে ‘প্রতিষ্ঠান’ পর্যন্ত- সকলেই মুখিয়ে থাকে! অথচ উত্তর আধুনিক এই যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর বিষয়টি হচ্ছে ‘গণমাধ্যম’ এবং এর ভূমিকাও তাই স্বাভাবিকভাবেই খুব জটিল। জটিল বললাম এই কারণে যে, ক্ষমতাধর যে কোনও কিছুই খুব স্পর্শকাতর। বিষয়টিকে পারমাণবিক বোমার সঙ্গে তুলনা করলে অনেকেই আঁতকে উঠতে পারেন, কিন্তু পারমাণবিক বোমার চেয়ে যে গণমাধ্যম, বিশেষ করে ডিজিটাল দুনিয়ায় ‘অনলাইন পত্রিকা’, ‘ফেসবুক’, ‘টুইটার’ ইত্যাদি যে কোনোভাবেই কম শক্তিশালী নয়, তা এতদিনে আমাদের কাছে স্পষ্ট। এর ব্যাপকতা সম্পর্কে তাই খুব সচেতন হওয়ার বিপরীতে অনেকেই যেন এর সহজলভ্যতাকে পুঁজি করে পথ চলছে।

অনেকেই আমরা এই পারমাণবিক বোমার মতো ভয়ংকর শক্তিশালী বিষয়টিকে নিয়ে কাজ করছি, তার ব্যাপকতা এবং ক্ষমতা সম্পর্কে খুব ভালোভাবে না জেনেই। গণমাধ্যমের ক্ষমতা কিংবা ব্যাপকতা কতটুকু তা বোঝা যায় যখন দেখি লোডশেডিংয়ে থাকা বাংলাদেশের কোনও গহিন গ্রামের কোনও এক বাড়ির পুকুরঘাটে জোছনার আলোতে বসেই অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারছি, আমেরিকার হোয়াইট হাউসে এই মুহূর্তে কোন ফরেন পলিসি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে! কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সিরিয়া-তুরস্ক-রাশিয়া কিংবা আমেরিকায় কী ঘটছে, তা দেখছি বা পড়ছি এই অনলাইন পত্রিকাগুলোর কল্যাণেই। তাই অনলাইন পত্রিকার ঘাড়ে দায়িত্বটাও বর্তায় একটু বেশি!

পৃথিবী এগিয়ে চলছে, আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার সিঁড়িতে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে- কে, কার আগে কোন খবরটি দিয়ে হইচই ফেলে দেবে! ফলে খবরের সত্যতা যাচাই-বাছাইয়ের চেয়ে মনোযোগ বেশি থাকে দ্রুত খবর প্রকাশে! আর গ-গোলটা সেখানেই ঘটে। তাছাড়া মুখরোচক খবর প্রকাশের প্রবণতা তো আছেই!

লক্ষ্য করেছি, বাংলা ট্রিবিউন এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নাম না লিখিয়ে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ খবর প্রকাশে বেশি সচেতন।

সেখানেই তার অনন্যতা প্রকাশ পায়। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যটি অক্ষুণ্ন থাকুক। তারুণ্যের দীপ্ততায় এই সচেতন পথচলায় এগিয়ে যাক আপন আলোয়! বাংলা ট্রিবিউনের কাছে এটাই প্রত্যাশা।

Sharing