cropped-rashedarawnakkhan.jpgএকটা সামাজিক লড়াই দরকার এই মুহূর্তে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে লড়াই, তার প্রস্তুতি চলছে! আমাদের বুর্জোয়া শ্রেণির জাতীয়তাবাদের ধারণা আর নিপীড়িত জনসাধারণের প্রতিরোধের চেতনা- এই দুইয়ের মাঝে গভীর পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আজ যেন কোনও এক অদৃশ্যমান বাঁধনে এক হয়েছে। যে বুর্জোয়া শ্রেণির স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা-জীবনাচরণ পরিচালিত হয় পশ্চিমা হেজিমনি দ্বারা, যাদের সম্পর্ক থাকে আন্তর্জাতিক পুঁজির সঙ্গে, সেই বুর্জোয়া শ্রেণিমানুষও যোগ দিয়েছে সাধারণের মিছিলে নয়া- সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য! কিছু নব্য রাজাকার ছাড়া প্রতিটি বাঙালি আজ দাঁড়িয়েছে প্রতিবাদের মিছিলে। এই মিছিলের সবটুকু হয়তো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু যতদূর দেখা যায় তা থেকেই অনুমান করা যায় এর শেষ প্রান্ত তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ঠেকেছে!
হলি আর্টিজানের মতো কোনও ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি ঘটতে না পারে, সেইজন্য আমাদেরকেই সতর্ক অবস্থান নিতে হবে, রাষ্ট্রকে হতে হবে অতন্দ্রপ্রহরী। আর সাধারণ মানুষ এখন আর জোট নাকি ঐক্য- এসব রাজনৈতিক নাটক দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকে না। জনগণকে বোকা বানানোর দিন শেষ হয়ে এসেছে! দেশের মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। আমাদের ইতিহাস বলে, জাতির প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে সাধারণ মানুষই বিশেষ করে তারুণ্যই লড়াই করেছে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে! তাই আমরা জনসাধারণ, বিশেষ করে এই দেশের তরুণরাই পারবে এই মুহূর্তে একটি সামাজিক লড়াই গড়ে তুলতে, জঙ্গিবাদীদের তৈরি ধর্মের নামে এই ‘অর্থনীতির রাজনৈতিক সন্ত্রাস’ এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে!

‘ধর্মের নাম সন্ত্রাস’ সারাবিশ্বে চলমান এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘অর্থনৈতিক রাজনীতি’তে আধিপত্য বিস্তার, বিশেষ করে আমাদের দেশের মতো উদীয়মান অথনৈতিক বাজার-ব্যবস্থার জন্য যে এটা চরম সত্য, এই বিষয়টি এখন আমাদের কাছে দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার! কোনও ‘চাঙ্গা অর্থনীতি’কে ভঙ্গুর করতে এবং একইসঙ্গে কোনও ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি’কে চাঙ্গা করার একটা রাজনৈতিক কূটকৌশল এটা, যাকে ‘ইসলাম ধর্ম’ এর নাম ব্যবহার করার মধ্যদিয়ে পরিচালিত করা হচ্ছে। ধর্মীয় মতাদর্শ ব্যবহার করে একটা গোষ্ঠী আসলে ‘তাদের’ ফায়দা লুটছে, এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা আমাদের সন্তানদের এই ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ‘ব্যবহার’ করছে।  তাই এই মুহূর্তে তারুণ্যকেই হতে হবে সবচেয়ে বেশি সচেতন। ফলে তারুণ্যের দায়িত্ব অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ এই অর্থে যে, তাদেরকে একদিকে এই ধান্ধাবাজ দুষ্টচক্র হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, অন্যদিকে জাতির অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বরাবরের মতোই তাদেরকেই এই অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। দুটো ক্ষেত্রেই তাই আমাদের প্রয়োজন বাড়তি সচেতনতা ও প্রস্তুতি।
তারুণ্যের ধর্মই হচ্ছে প্রগতিশীল কিংবা রেডিক্যাল গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথকে বেছে নেওয়া। কিন্তু সেই পথ বাছাই করার সময় যে ধারণাটি খুব বেশি প্রভাবিত করে, তা হলো জাতীয়তাবাদের ধারণা। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে জাতীয়তাবোধের আদলে ধর্মগত চেতনাকে ভুলভাবে কাজে লাগিয়ে তারুণ্যের একটা ক্ষুদ্র অংশকে বিপথগামী করা হচ্ছে। সেজন্য আমরা নিজেরাই যদি ভালোভাবে জানি যে জাতীয়তাবোধের চেতনা কী? ধর্ম কী? ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা, ইসলামের কথা, ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের মগজ যদি পরিষ্কার থাকে, তাহলে বাইরের থেকে আর ধোলাই হবার আশংকা  থাকবে না, কিন্তু আমরা নিজেরাই যদি মগজ অপরিষ্কার রেখে দেই, তাহলে কেউ তা ধোলাই করতে আসতে পারে! তাই আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে, নিজেদের মগজ নিজের জ্ঞান দ্বারা ধোলাই করে ফেলা, যাতে অন্য কেউ এসে ধোলাই করতে না পারে! ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি যেকোনও বিষয়েই আমাদের মনে কোনও প্রশ্ন, সন্দেহ কিংবা ভাবনার উদ্রেক হলে আমরা বাবা-মা, ভাই-বোন, বিশ্বস্ত বন্ধু কিংবা শিক্ষক কিংবা সেই বিষয়ের ওপর যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন এমন ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে ধারণা স্পষ্ট করে নিতে পারি। কোথাও সন্দেহ হলে একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করে ক্রস-চেক করে নিতে পারি।

উত্তর আধুনিক সময়ের লেখক হোমি ভাবার ধারণা হতেই প্রশ্ন করতে চাই, বিশেষ করে বিশ্বায়নের এই যুগে হাইব্রিড আমরা- আমাদের দেশ, ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে আর কতটুকুইবা জানি? এই যুগে জন্মানোর ফলে নাচ, গান, কবিতা, তবলা, কোরআন তেলওয়াত শেখা হতে শুরু করে পরীক্ষায় এ প্লাস পাওয়ার জন্য দিনে ৩-৪ বার কোচিংয়ে যাওয়ার ভিড়ে ধর্মের সঠিক জ্ঞান লাভ আমাদের পক্ষে কতটুকু সম্ভব এই ২০-২৫ বছর বয়সে? একদিকে হাইব্রিডের প্রভাব, অন্যদিকে জাতীয়তাবোধের চেতনা আমাদেরকে কি পথভ্রষ্ট করে ফেলছে?  ভাবা ‘হাইব্রিডিটি’র ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে ‘জাতীয়তাবাদে’র ধারণাকে খারিজ করে দিলেও আমি অবশ্য এই দুয়ের সমন্বয়হীনতাই একধরনের ক্রাইসিস তৈরির কারণ বলে মনে করছি।

ফ্রানৎস ফানোর জাতীয়তাবাদের ধারণা হতে কি বলতে পারি, আমাদের দেশে কিছু তরুণ জাতীয় চেতনার সংকটে পড়েছে, যা হতে ধর্মীয় চেতনাকে অতি জাতীয়তাবাদ বা শোভিনিজমে পরিণত করছে, যা আসলে শেষ পর্যন্ত নিজ সম্প্রদায় নয়, বরং অন্যকেই জয়ী করে দিচ্ছে?  ইসলাম ধর্ম যেখানে কঠিন ভাষায় গীবতকারীকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে যে, একজন মুসলিম অন্য মুসলিম ভাইয়ের অগোচরে কোনও গীবত বলতে পারবে না, এবং বললে কবিরাহ গুনাহ হবে, সেখানে শোলাকিয়াতে এতো মুসলিম মারতে যাওয়ার কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে? বিপথগামী এই তরুণেরা কি জানতে চেয়েছিল তাদের ‘স্যার’ এর কাছে?

জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন অর্থ আছে, এই অর্থ সামষ্টিকভাবে উচ্চারিত হলেও শেষ বিচারে ব্যক্তি মানুষের নিজস্ব ধারণায়নের ওপরই নির্ভরশীল। ব্যক্তি মানুষটি যে সমাজে বসবাস করে সেই সমাজের বিভিন্ন সামাজিক প্রপঞ্চের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মতাদর্শিক আবেগকে ঘিরেই নির্মিত হয় ব্যক্তির ভেতরে বেড়ে ওঠা ‘জাতীয়তাবোধ’-এর ধারণা, যার প্রকাশ আবার ব্যক্তি সমষ্টির সঙ্গে মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে ঘটিয়ে থাকে। যেমন: ‘৫২ তে আমরা ভাষাগত দিক হতে জাতীয়তাবোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম এবং তা ছিল সাধারণের লড়াই! আমরাই সম্ভবত একমাত্র জাতি, যারা কিনা পৃথিবীতে ভাষার জন্য লড়াই করেছে এবং প্রাণ দিয়ে গেছে অকাতরে এবং একটি জাতিরাষ্ট্র তৈরির সোপান তৈরি করেছে সাধারণ মানুষই!  জাতিসত্তার রাজনীতিতে এটা বেশ বিরল! আমাদের মনে রাখতে হবে, পাশ্চাত্যের কিংবা মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জাতিসত্তা আর আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়ের মাঝে একটা বিশাল ব্যবধান রয়েছে! একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবো, পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশেই একইরকম ভাষায় অর্থাৎ ইংরেজিতে কথা বলে, মধ্য প্রাচ্যের অনেক দেশের ভাষাই আরবি। সেদিক হতে আমরা বাঙালিরা এক হয়ে নিজেদের ভাষার জন্য লড়াই করেছি নিজেদের জীবনের বিনিময়ে।

অতএব, ইংরেজি ভাষায় কিংবা আরবি ভাষায় যারা কথা বলে, তাদেরকে এক জাতি ভেবে ব্রাদারহুড তৈরি করতে হবে, এই ভ্রান্ত ধারণা আমাদের মাঝে আসবেইবা কেন? তাদের সঙ্গে না আছে আমাদের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, চিন্তা-ভাবনা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যের মিল, না আছে ভাষার মিল! তাহলে অ্যান্ডারসনের সেই ‘কল্পিত সম্প্রদায়’ ভাবার কি অবকাশ আছে এক্ষেত্রে? ধর্মের মিল কিংবা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি? তা তো যুগ যুগ ধরেই ছিল বা আছে, তাহলে হঠাৎ করে কী এমন ঘটলো যে, আমাদের ধর্মভিত্তিক কল্পিত সম্প্রাদয়ের অংশ হয়ে নিজেদের সম্প্রদায়ের মানুষজনকে মেরে ফেলতে হবে? তাহলে বোঝা যায় ধর্ম নয়, বরং আমাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়াই তাদের একমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।

‘ধর্মভিত্তিক কল্পিত সম্প্রদায়’ দ্বারা উজ্জীবিত হয়ে এখন যে তরুণেরা জঙ্গি হচ্ছে, তারা কি ভেবেছে, ইরাক-ইরানের সহোদরদের মাঝে যুদ্ধ কেন ঘটলো? কারা ঘটিয়েছে সেই যুদ্ধ? কে অস্ত্র দিল? কেন দিল? কারা দিন শেষে অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হয়ে উঠলো এই যুদ্ধ হতে? আইএসকে অস্ত্র জোগাচ্ছে কে বা কারা? বৈশ্বিক ধনতন্ত্রের কাঠামোতে আমাদের জাতীয়তাবাদের ধারণা কতটা ভিন্ন, কিভাবে ভিন্ন- তা তাদের বিবেচনায় নিতে হবে। ভাবতে হবে, কেন কিসের উদ্দেশ্যে আমাদেরই কিছু তরুণদের ধর্মগত জাতীয়তাবোধের চেতনা মগজে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে বিপথে নিচ্ছে এক বা একাধিক গোষ্ঠী তাদের পারস্পরিক স্বার্থের প্রয়োজনে, যার সঙ্গে কোনওভাবেই সামগ্রিক জাতিসত্তার কোনও যোগসূত্র নেই। যদি যোগসূত্র থাকতো, যদি ধর্মীয় মূল্যবোধ হতেই এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো হয়, তবে তা মক্কা কিংবা শোলাকিয়াতে মুসলিম জাতির ওপর এই ধরনের তাণ্ডব চালানোর নীলনকশা আঁকা হতো না। তাহলে মনে কি প্রশ্ন জাগে যে, তাদের এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কতটা ধর্মীয় মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত আর কতটা মতাদর্শগতভাবে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ দ্বারা প্রভাবিত?

জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব তো বলে, নিজ সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার কথা, অন্যদিকে জঙ্গিরা তো নিজ সম্প্রদায়কে রেহাই দিচ্ছে না-না মুসলিম, না বাঙালি! তাহলে তাদের মতাদর্শিক অবস্থানটা কী?  যেখানে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কিউবা, বলিভিয়া কিংবা ভেনিজুয়েলার লাখো মানুষ সাহসী উচ্চারণে কেবল সংহতি প্রকাশ নয়, প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, সেখানে কিনা আমরা শোভিনিজমের মধ্যদিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে উসকে দিচ্ছি? বিপথগামী তরুণেরা কি তাদের চেতনার জায়গা সম্পর্কে নিজেরাই ওয়াকিবহাল? মানুষ কি কেবল নিজের জন্য বাঁচে? এই জীবনের উদ্দেশ্য কি কেবল নিজের স্বার্থ দেখা? কেবল নিজে বেহেশত যাবো, সেটাই একজনের জীবনের মূল লক্ষ্য হতে পারে? কতোটা স্বার্থপর প্রাণী, শোভিনিস্ট হলে কেউ এভাবে নিজের স্বার্থ নিয়ে ভাবতে পারে? কেবল কিছু মানুষ মারলে বেহেশত নিশ্চিত হয়, সেইজন্যই মানুষ মারতে হবে? তাহলে নামাজ-রোজা-হজ-যাকাত এসবের কী দরকার ছিল। এতো সহজ যদি হয় বেহেশত পাওয়া, তাহলে বেহেশত কেন ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্থান? সারাজীবন নামাজ পড়া, কোরআন খতম দেওয়া, বছরে ত্রিশ রোজা রাখা, জীবনের শেষ সম্বল বিক্রি করে হলেও হজে যাওয়া, নিজের কষ্টার্জিত অর্থ হতে যাকাত প্রদান করা, ফেতরা, ছদগা দেওয়া-এসবের কি দরকার ছিল?

অতএব খুব স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে, এটা কোনও ‘ধর্মীয় মতাদর্শ’ দ্বারা তাড়িত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নয়, বরং ‘অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসী’ কার্যকলাপ! তারুণ্যকে এটাও মনে রাখতে হবে, জাতীয়তাবোধের চেতনার সঙ্গে সামগ্রিকতাবোধের একটা সম্পর্ক আছে, কিন্তু এই একটি ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে সামগ্রিকতা তো দূরে থাকুক, হাতে গোনা কয়েকজন তরুণ বিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত হচ্ছে । এই বিযুক্ত বিপথগামী তরুণদের গোটা সমাজ তো বটেই, স্বয়ং তাদের মা-বাবা তাদের মৃত দেহের ওপর অভিসম্পাত করছে!

তারুণ্যকে জঙ্গিবাদের উৎসগুলো সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। পারিবারিক দুর্যোগ, মানসিক দুর্বলতা, সামাজিক অবক্ষয়, রাষ্ট্রের নিপীড়ন-দুঃশাসন, যা তারুণ্যকে রেডিক্যালাইজেশনে উদ্বুদ্ধ করে। পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়ন, দেশের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা, অর্থনৈতিক অসামঞ্জ্যতা, দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের নির্লিপ্ততা, এসবের কারণে তারুণ্য কি একটা ‘আইডেনটিটি ক্রাইসিস’ এর  মাঝে পড়েছে? মনের গহীনে একটা অসহায়ত্ববোধ কাজ করছে, সেখান থেকে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইচ্ছা জাগ্রত হচ্ছে, রেডিক্যালাইজড হচ্ছে? কিন্তু কোন ধরনের চেতনাবোধ থেকে এই ধরনের প্রতিরোধ প্রবণতা গড়ে উঠছে আমাদের মনে, তা ভেবে দেখতে হবে। প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-লড়াই আমাদের করতেই হবে, অন্যায়-অবিচার-অত্যাচারের বিরুদ্ধে তারুণ্য কথা না বললে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ না করলে আর কে করবে? আমাদের কথা বলতে হবে, সরকারি-বেসরকারি নানান ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে, আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আদায়ের লক্ষ্যে, শ্রেণি বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যে তারুণ্যেই লড়াই করবে। কিন্তু সেই প্রতিবাদের চেতনা জাগ্রত হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে নয়, ধর্মকে নিয়ে নয়! লড়াই শুরু হয়ে গেছে এই ধরনের ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে, জঙ্গিবাদের অশুভ চেতনার বিরুদ্ধে! লড়াই করতে হবে সমাজের অসমতার বিরুদ্ধে, সমাজের ঘুনে ধরা কাঠামোর বিরুদ্ধে। কিন্তু আমাদের এদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে যে, আমাদের এই প্রতিরোধের-প্রতিবাদের প্রবণতাকে, এই সমতা আনার চেতনাকে বিভিন্ন নাশকতামূলক অশুদ্ধ ভাবনা যেমন ‘জবাই করলেই বেহেশত নিশ্চিত’ এই ধরনের ডিসকোর্স দ্বারা সহিংস রেডিক্যালাইজেশনে কোনও গোষ্ঠী আমাদেরই কাউকে কাউকে ‘ব্যবহার’ করছে কিনা। নয়তো তারুণ্য হেরে যাবে, হেরে যাবে বাংলাদেশ, পরাজয় ঘটবে মানবতার।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

BanglaTribune.com

Sharing