cropped-rashedarawnakkhan.jpg

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঈদের মধ্যে এমন কিছু নিয়ে লিখবো ভাবিনি। ভেবেছিলাম, অনেক আনন্দের কিছু লিখবো! তা আর হলো না!  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আকতার জাহানের জলির আত্মহত্যার খবরটা মনের ভেতর একটা চাপা কষ্ট তৈরি করছে! একটি খবর, কিন্তু হাজার থেকে লাখো প্রশ্ন মনকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে! ভাবনাগুলো খুব বিচ্ছিন্নভাবে আছে, যদিও যোগসূত্রতা খুব স্পষ্ট!
খুব ভালো করে আকতার জাহানের সুইসাইড নোটটা পড়লে অনুমান করা যায়- তার আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী কে বা কারা! নাকি আমরা সবাই অপেক্ষা করছি অনেক না জানার ভান করে… যেন কেউ কোনও কিছুই জানি না? আমাদেরকে বিশেষ কিছু জানাবেন বিশেষজ্ঞ দল! একটি বেসরকারি টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মাহফুজ মিশু তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে ‘আত্মহত্যা এক ধরনের হত্যা। আমরা জানি, আপনি নিজেকে হত্যা করেননি আপা। কে খুনি, এই আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী তাও জানা। এখন পরীক্ষার সময়। ন্যায়ের, সত্যনিষ্ঠতার। সেই পরীক্ষায় আমরা মানে রাষ্ট্র-পুলিশ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আপনার সহকর্মী- শিক্ষার্থীরা পাস করতে পারি কিনা, তার ওপর নির্ভর করছে ঘাতকের শাস্তি’।
আকতার জাহানের একসময়ের সহকর্মী এবং বন্ধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি শাওলী মাহবুব তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে সরাসরি লিখেছেন, ‘গত সতের বছর তুমি আমার কে ছিলে তা শুধু আমিই জানি Akter Jahan. তোমার ঋণ আমি কোনওদিন শোধ করতে পারব না। প্রতি সেকেন্ডে তোমার প্রাক্তন স্বামী তোমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেই বিচার আমি আজ কার কাছে চাইব?’-  পাঠক, এই ধরনের লেখা হতে কী বোঝা যায়? গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে সারাক্ষণ তার আত্মহননের খবর! চলছে সুইসাইড নোটটির ন্যারেটিভ বিশ্লেষণ! কিন্তু যেসব প্রশ্নের ‘উত্তর’ খুঁজছে মাননীয় বিশেষজ্ঞবর্গ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা, তিনি কি তার নোটেই তা জানিয়ে দেননি? তবুও কেন এই জানা ‘উত্তরের’ অনুসন্ধানী তৎপরতা চলছে, তার লিখে যাওয়া ‘উত্তর’কে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, প্রশ্নবিদ্ধ ‘উত্তরের’ অনুসন্ধান চলছে, যে ‘উত্তর’ আসলে প্রশ্নবিদ্ধ নয় বরং একেবারে পরিষ্কার করে লেখা, তা হয়তো অনেকের মতো আমারও বোধগম্য নয়! 

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় আমরা ‘অবলা’ নারীকে যত সহজে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করতে পারি, পুরুষের জন্য তা যে আমাদের তথা পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য সহজ নয়, তা একদমই অনুমেয়। নারীর জন্য তো আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা নয়। মনে আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানার চোখ তার স্বামী উপড়ে ফেলার ঘটনা? এতে আমরা যতটা চিন্তিত কিংবা উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছিলাম, আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি ঘটনা যদি উল্টো হতো, অর্থাৎ রুমানা তার স্বামীর চোখ উপড়ে ফেলতো, তাহলে এই খবর বাংলাদেশ তো বটেই, পুরো বিশ্ব জুড়েই তোলপাড় তুলতো! অর্থাৎ ঘটনার নায়ক যখন ‘নারী’, তখন আমাদের পুরুষতান্ত্রিক ‘গণমাধ্যম’ এবং পাঠক হিসেবে আমাদের ‘মন-মানসিকতা’ উভয়ই খুব আগ্রহী হয়ে ওঠি ‘খবর তৈরি’ এবং তা ‘বিলি-বন্টনে’! রুমানাকেও কানাডিয়ান বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং তা নিয়েই এই ঘটনার সূত্রপাত বলে ঘাতক স্বামীকে বাঁচিয়ে দিতে চেয়েছিল একদল মানুষ! হায়রে আমাদের সমাজ, নারীর জন্য তুমি নয়!v_r-0401

আর যখন পুরুষ কর্তৃক সংঘঠিত হয়, অর্থাৎ অঘটন এর নায়ক যখন ‘পুরুষ’ তখন আমাদের অনাগ্রহ ভেবে দেখার মতো! এইধরনের অনাগ্রহের উদাহরণ আমি ভুরি ভুরি দিতে পারি। চলুন মিলিয়ে দেখি নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে, আমরা কি এখন আর অবাক হই, যদি শুনি কোনও স্বামী যৌতুকের লোভে স্ত্রীকে মেরে ফেলছে, গায়ে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছে? গর্ভের সন্তানকে গর্ভেই নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে মা সহ?  কিংবা কোনও বখাটে যুবক এসিড ছুড়ছে কোনও নিষ্পাপ কিশোরীকে, সম্পত্তি-টাকা-পয়সা-জমিজমার বিরোধ নিষ্পত্তিতে নিজ জ্ঞাতির শিশুদের মেরে ফেলছে, এসব খবরকে কি আমরা খুব অস্বাভাবিকভাবে নিয়েছি, আঁতকে উঠেছি, বিচারের জন্য প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি? এই অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো কিভাবে, কেন, কোন প্রক্রিয়ায় একসময় আমাদের কাছে ‘স্বাভাবিক’ খবর হয়ে ওঠে, সময়ের পরিক্রমায় দৈনন্দিন জীবনের আটপৌরে ঘটনায় পরিণত হয়, তা কি ভেবে দেখেছি? কেন এইসব খবর আমাদেরকে আর  ভাবায় না, আন্দোলিত করে না, দিধান্বিত করে না, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠিত করে না, উত্তেজিত করে না, ভেবে দেখা দরকার! যেন এমনটিই হওয়ার কথা সমাজে। সেসব নিয়ে কি কখনও নিজেকে, বাবা-মা কে, আত্মীয়-স্বজন-বন্ধুবান্ধবকে জিজ্ঞাসা করেছি? কেন পুরো সমাজ-আমরা- আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা সবাই ‘নীরব’ থাকি এই ধরনের সহিংসতার খবর শুনে? যে দেশে নারী সহিংসতার বিরুদ্ধেই আমরা কথা বলতে ভুলে গেছি, সেদেশে আত্মহত্যার পেছনে প্ররোচনা আছে কিনা তা নিয়ে কথা বলার সময় কোথায়?

তাছাড়া পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় আমরা আবার দ্বিমুখী আচরণে পারদর্শী! যেমন, পুরুষ ঘটাচ্ছে প্রতিনিয়ত যা, তা খুব স্বাভাবিকভাবে নিলেও, একজন নারী বা মা একই ঘটনা ঘটালে যেন পুরো জাতি ইমেজ সংকটে পড়ে যায়! ‘একজন পুরুষ যাই করুন না কেন, একজন মা/নারী বহির্জগত তো দূরের কথা, পরিবারের ভেতরেও কোনও প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধ করতে পারবেন না’- এই নির্মিত ইমেজের বাইরে আমরা যেতে পারি না, সেই জন্যই কি এত হই-চৈ, আলাপ-আলোচনার সূত্রপাত হয় একজন নারী যখন ঘটনার মূল নায়ক? বাবা যখন সন্তান হন্তারক, তা নিয়ে একদিন খবর প্রকাশ হলেও মা মাহফুজা যখন সন্তান হন্তারক, তার খবর মাসের পর মাস প্রকাশ হওয়া চাই!

‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’- নারী যেন কেবল এই ইমেজই আটকে থাকবে! এর বাইরে নারীর কোনও উচ্চারণ থাকতে পারে না? যেইমাত্র উচ্চারিত হয় নারীর কণ্ঠ, তখনই উচ্চকিত হয়ে ওঠে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কণ্ঠস্বর বিভিন্ন ভঙ্গিমায়, বিভিন্ন ভাষায়! কী আশ্চর্য! আশ্চর্য হচ্ছি যখন দেখছি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আকতার জাহানের আত্মহত্যার খবরটা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন কোনও সুর টেনে বের করার চেষ্টা করছেন একদল। কেউ কেউ খবরটির প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে লিখছেন, ‘একজন শিক্ষক কেন লড়াইয়ে পরাজিত হবেন’, ‘স্বামীর সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো না কেন?’, ‘সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা যেতো না?’, ‘আমাদের সমাজে একলা মায়ের পথ চলা যায় কি যায় না?’ ইত্যাদি বিতর্কের বলয়ে এইধরনের আত্মহত্যার জন্য আসলে কে বা কারা দায়ী, সেটাই আড়াল হয়ে যাচ্ছে !

এই ধরনের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বা বিতর্ক আমরা অনেক করতে পারি, কিন্তু সম্পর্ক আসলে তত্ত্ব কথার বিষয় নয়, বরং চর্চার বিষয়, ভালোবাসার বিষয়, অনুভব কিংবা অনুধাবনের বিষয়। পরিবারের ধারণায় স্বামী-স্ত্রীর সমান অধিকার থাকবে, ভালোবাসা-মায়াময় সম্পর্ক-প্রেম-পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকবে, এমনটাই মানুষ স্বাভাবিকভাবে আশা করে। সেই আশা সকলের ক্ষেত্রে পূরণ হবে বা সমানভাবে হবে, এটা ধরে নেওয়া যাবে না, এটাও ঠিক। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, যেকোনও সময় বর্তমান সম্পর্কের মাঝে ভিন্নতা আসতে পারে। প্রতিটি মানুষ ভিন্ন, প্রতিটি মুহূর্তও ভিন্ন, প্রতিটি মানুষের পারিবারিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক তথা সামগ্রিক প্রেক্ষাপটই ভিন্ন। তাই প্রত্যেকটি মানুষের জীবন এবং যাপনের ধরণ-ধারণে ভিন্নতা আছে এবং এখন ভিন্নতা না থাকলেও পরমুহূর্তে ভিন্নতা তৈরি হতে পারে ! এই ভিন্নতা দুজন একইভাবে মেনে নেবে, সেটাও আশা করা ভুল! তবে দুজনই যেন অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও ঘটনার শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে পারে, সেজন্য পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে না পারলে পাছে  যে সন্তানকে এই পৃথিবীতে দুজনে মিলে এনেছে, সেই প্রিয় মানুষটিই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেমন এই মুহূর্তে তাদের একমাত্র ছেলে সোয়াদের মতো অসহায়ত্ব নিয়ে এই পৃথিবীতে আর কেউ হাঁটছে না।

ভালোবাসাহীন আধিপত্যশীল সম্পর্ক কেবল বিচ্ছিন্নতাই তৈরি করবে, সেতুবন্ধন নয় এটাই স্বাভাবিক। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা নানাভাবে নারীকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় পারিবারিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাষ্ট্রীয় নানা কর্মকাণ্ড হতে, যেমন নারী পরিবারের জন্য রান্না করবে ঠিকই, দিন-রাত এক করে সেবা দেবে স্বামী-সন্তানকে, কিন্তু পরিবারের কোন সন্তান কোথায় পড়বে, সেই সিদ্ধান্ত কয়জন মা নিতে পারেন? আবার একজন নির্যাতিত মা যখন অবহেলিত-নিপীড়িত হয়ে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তখন সন্তান মায়ের কাছে থাকবে, নাকি বাবার কাছে থাকবে, সেই সিদ্ধান্তও জন্মদাতা মায়ের পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থা তা নির্ধারণ করবে! আদালতে একজন মা সন্তানের অভিভাবকত্ব দাবি করতে গেলে কী ধরনের অপমান-অপদস্তের শিকার হতে হয়, তা আমি আমার কিছু সহকর্মীর লেখা হতে জানতে পেরেছিলাম। সে এক ভয়ানক অভিজ্ঞতা! যাক সেই প্রসঙ্গ আজ নয়। তাদের লেখা হতে জানতে পেরেছিলাম, আদালত যদি কোনও কারণে মাকে তার সন্তানের  অভিভাবকত্ব দিয়েও থাকে, তারপরও চলবে তার ওপর বাচ্চার বাবার পক্ষ হতে মানসিক নির্যাতন এবং সামাজিক অপমান এমনকি চরিত্র হরণের মতো ঘটনাও!

আমাদের কাছে ‘আদর্শ পরিবার’ মানে কখনও স্বামী-স্ত্রীর সমান অধিকার নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদের সেখানে জয়জয়কার! আর বিয়ের মতো আধিপত্যশীল সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়ায় ‘সাত চড়ে রা নেই’ ধরনের মেয়েদের প্রতি আমাদের পাত্র পক্ষের আকর্ষণ বেশি, যাতে চাইলেই চড় মারা যায়! এই চড় সবসময় যে শারীরিক হতে হবে তা নয়, শ্রেণি ভেদে তা কখনও মানসিক, কখনও সামাজিক, কখনও বা শারীরিকও হতে পারে। তাই বাবা-মা হিসেবেও ‘সাত চড়ে রা নেই’ টাইপ মেয়ে গড়ে তুলতেই আমরা বেশি আগ্রহী!

আমরা জাতিগতভাবেই একটি মেয়েকে ‘মেধাবী’, ‘চৌকষ’, ‘সবল’, ‘আত্মবিশ্বাসী’ হিসেবে গড়ে তোলার চেয়ে  ‘কোমল’ করে গড়ে তুলতে বেশি পারদর্শী!  বাবা-মা, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র  যথাসম্ভব সর্বোচ্চ সময় নিয়ে আমাদের শিখিয়ে থাকেন ‘সাত চড়ে রা নেই’ টাইপ মেয়ে হওয়ার প্রক্রিয়া। উদাহরণ দিয়েই বলি- পাঠ্য-পুস্তকে একজন মেয়ে আর একজন ছেলের মাঝে কী কী পার্থক্য থাকা চাই, তা চোখে আঙুল দিয়ে শেখানো হয় প্রতিটি ক্লাসে! মেয়ের জন্মদিনে আত্মীয়স্বজনরা কী উপহার দেয়, আর ছেলের জন্মদিনে কী উপহার দেয়, তা লক্ষ্য করলে সমাজের তফাৎ তৈরির প্রক্রিয়া বুঝা যায়! রাষ্ট্রের একপেশে চরিত্র ধরা দেয় যখন বিশ্বজয়ী কলাপাড়াসুন্দরীর ফুটবলারদের লোকাল বাসে যেতে হয়, অন্যদিকে সাকিব-মাশরাফি-তামিমদের বিশ্বতারকাদের মতো করেই ‘ট্রিট’ করা হয়!  ‘হিরো’ চরিত্রগুলো ছেলেদের নামেই, কখনও ‘মেয়ে’দের হয়ে ওঠে না!

বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত কয়টি সিনেমা তৈরি হয়েছে, যেখানে নারীকে দেখানো হয়েছে ‘মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী, আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন, বিচক্ষণ, দাপুটে’ চরিত্রে? অথচ বিপরীতে লাখো ছবির নাম বলে দিতে পারবো, যেখানে নায়কের চরিত্র হীরকের চেয়েও শক্ত আর বলিষ্ঠ! কয়টি কবিতা আছে, যেখানে নারীকে দেখানো হয়েছে ‘বুদ্ধিমতী,সাহসী’ হিসেবে? কবির চোখে তো নারী বরাবরই ‘ফুলের মতো নরম, নদীর মতো বহমান’! গল্প-কবিতা-উপন্যাসে কোথায় আছে সেই নারী, যে নারীকে দেখে বা পড়ে আমাদের সমাজের মেয়েরা বুদ্ধিমতী, সাহসী হয়ে উঠবে? যুগে যুগে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কেবল পেরেছে নারীকে দাবিয়ে রাখতে, পারেনি এই খোলস ছাড়িয়ে নারী মুক্তির কথা বলতে! রবীন্দ্রনাথের ‘সাধারণ মেয়ে’ হয়ে ওঠার মাঝে আমাদের যেন কোনও ক্ষোভ-দুঃখ-গ্লানি নেই, কারো কারো হয়তো হতাশা আছে, পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা প্রাপ্তির কারণে কারও হয়তো সেটুকও নেই!

যখন একটি সমাজের সকল ক্ষেত্রে নারীকে দুর্বল করে চিত্রিত করা হয়, তখন একজন নারী কতোটাইবা স্রোতের বিপরীতে হেঁটে যেতে পারে? আমাদের চোখে একজন ‘আদর্শ নারী’ মানেই হলো স্বামী-সন্তানের দেখভাল করবে, চাকরি করলে ঘর-বাহির দুটোই সামলাবে! এই ইমেজ থেকে বের হওয়া মাত্রই নারী হয়ে ওঠে ‘বদ চরিত্রের, বড় মেজাজি, বহির্মুখী’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এখনও কোনও দম্পতির ডিভোর্স শুনলে প্রথমেই আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মগজে নারীটির দিকেই সকলের অভিযোগের দৃষ্টি থাকে।  তাই যেসব নারী ঘর ছেড়েছেন, সেসব নারীকে আত্মীয় হিসেবে আমরা এক/দু কথা শুনিয়ে দিতে একটুও কার্পণ্য করি না! সুযোগ পেলেই শুনিয়ে দেয় তাকে- ‘মেয়েদের সংসারটাই বড় কথা!’, ‘মেয়েদের সংসারে মানিয়ে নিয়ে চলার মাঝেই সার্থকতা’, ‘সংসার না থাকলে নারীর দাম নেই’!

এসব কথাকে আমলে আনলে কখনও কখনও একজন নারীকে নিজের সঙ্গে লড়াই করতে হয়, মানিয়ে নিতে নিতে একসময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, শারীরিকভাবেও ভেঙে পড়ে। সেটা তার একান্ত নিজের লড়াই! একজন মানুষ নিজে নিজে আর কতক্ষণ লড়াই করে যেতে পারে এতটা বিরূপ পরিবেশে? তখন কেউ কেউ না পেরে ‘ঘর’ ছেড়ে বের হয়ে আসে।

পুরুষতান্ত্রিক এই ‘বৃত্ত’ কিংবা ‘ঘর’ ছাড়লে তো কথাই নাই! নিজের সঙ্গে তো বটেই, সারা দুনিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে হয় প্রতিনিয়ত! ছেলে’র ডিভোর্স হলে ‘বৌ’এর দোষ দিয়ে আমরা ‘স্বাভাবিক’ভাবে চলতে পারলেও মেয়ের ডিভোর্সকে আমরা কোনোভাবেই ‘স্বাভাবিক’ ভাবতে পারি না! মেয়ের ডিভোর্স মানেই যেন পরিবারের ‘জাত’ গেলো! বাবা-মা হতে শুরু করে আত্মীয়স্বজন অনেকেরই আকার ইঙ্গিত এমন যে- ‘একটু কি মানিয়ে নেওয়া যেতো না জামাই এর সাথে?’,  ‘জামাই তো পুরুষ মানুষ, পুরুষরা এক-আধটু এমন হয়ই, আরেকটু সমঝোতা করে দেখ না…’, ‘কই, অমুকের মেয়ের তো সমস্যা হচ্ছে না, তোমার একটু বেশি বেশি রাগ’। যেন মেয়েটির তার ভালোবাসার ঘর-সংসার-পরিবার ছেড়ে আসতে নিজের কোনও কষ্ট হয়নি, সব কষ্ট আমাদের মতো আশেপাশের আত্মীয়-স্বজনদের!

সম্পর্কের মাঝে কতটা ফাটল ধরলে পরে একজন নারী সিদ্ধান্ত নেয় যে, তিনি আর ওই ‘ঘরে’ বাস করতে পারবেন না, যে ঘর ছেড়েছে, কেবল তা সেই জানে। অতএব আমরা যারা মেয়েটির আশেপাশের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব তাকে বিরূপ সময়টা কাটিয়ে উঠতে যদি সাহায্য না করতে পারি, তবে যেন দূরে থাকি, কাছে এসে ত্যক্ত-বিরক্ত করে তাকে আত্মহননের দিকে ঠেলে না দেই! আমি অনেক উচ্চশিক্ষিত পরিবারকেও দেখেছি, মুখে না বললেও মেয়ের ‘ডিভোর্স’ হওয়াটাকে ‘সমস্যা’ হিসাবেই চিহ্নিত করেন বা করতে বাধ্য হন। সারাক্ষণ আত্মীয়-স্বজনের সামনে ‘অপরাধীর’ চেহারা নিয়ে থাকতে হয়! কিন্তু কেন? কারণ আশেপাশের আত্মীয়-স্বজনদের মেয়ে শশুর বাড়িতে ‘মহাসুখে’ দিন যাপন করছে, তাদের অট্টহাসির কাছে নিজেকে ‘পরাজিত’ মনে হয়!  অথচ এই অট্টহাসির ধারক বাবা মা হয়তো জানেওনা, তাদের মেয়েটিও হয়তো একইভাবে নিজেকে ‘পরাজিত সৈনিক’ই  মনে করে শ্বশুরবাড়িতে। পার্থক্য কেবল এতটুকুই যে, তাদের ‘মহাসুখী’ মেয়েটি ওই ‘ডিভোর্সি মেয়েটি’র মতো আত্মসম্মানবোধ নিয়ে বের হয়ে আসতে পারেনি। অথবা বাবা-মা যেন এইরকম অট্টহাসিতে জীবন পার করে দিতে পারে, তাই এই ‘মহাসুখী’ মেয়েটি আত্মত্যাগ করছে নিজেকে ‘সুখী’ দেখিয়ে!

আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন, নিজে ‘সুখী’ বলে অন্যের ‘অসুখী’ সময়কে  তোয়াক্কাতো করেনই  না, বরং কখনও কখনও স্থুলবুদ্ধিতে নিম্নমানের কিছু কাজ করে থাকেন যেমন, ‘অন্য’ কেন অসুখী তার একটা নিজের মতো ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে গল্প-গুজব তৈরি করে মানুষকে শুনিয়ে একধরনের আত্মতৃপ্তি লাভ করেন! সেটাই হয়তো সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনকভাবে সহজ উপায়ে মানুষকে মানসিক আঘাত করার একটা কৌশল। এই কৌশলকে যারা বুঝে ফেলেন, তারা জীবনের সাথে সাথে লড়াইটাকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, যেমন পেরেছে অভিনেত্রী প্রভা। অনেককেই কটাক্ষ করে বলতে শুনেছি, ‘মেয়েটা এতকিছুর পরও অভিনয় করে যাচ্ছে?’, ‘আমি হলে আত্মহত্যা করতাম’।

মানুষের দুঃসময়ে সমাজ ও সমাজের আমরা কতটা নির্মম হতে পারি তার প্রমাণ বোধহয় আর দেওয়ার প্রয়োজন হবে না! একটা মানুষ জীবনে একটা না হয় ভুল করেছেই, তার জন্য এভাবে প্রতি মুহূর্তে তাকে অপমান করার অধিকার আমাদেরকে কে দিয়েছে? আর যে তাকে এভাবে শেষ করে দিতে চাইলো, ‘পুরুষ’ বলে তাকে নিয়ে আমাদের ‘সচেতন-শিক্ষিত’ সমাজের কিছুই বলার নেই? এতকিছুর পরও একটা মেয়ে অসম সাহসের সাথে সে তার পূর্বের কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে, সেটা নিতে পারছে না আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও আমাদের মন-মানসিকতা, বাহবা দেওয়া তো দূরে থাক!

কিন্তু সবাইতো এই দলের নয়। কেউ হয়তো একেবারেই পারেনা লড়াই করতে। মানুষ তখন পালতে চায় এই জীবন থেকে। আত্মহননের পথ বেছে নেয়। যেমনটি নিয়েছেন শিক্ষক আকতার জাহান জলি। তাই এইসব মানুষের লড়াইয়ে সহযোদ্ধা না হতে পারি, কিন্তু তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে আমরা নিজেরাই যেন দায়ী হয়ে না পড়ি!

logo_bati

পূর্বে প্রকাশিত

Sharing