rasheda-3

শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুক, টুইটার, গুগল তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কি এই সময়ে আমাদের ‘বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী’ বানিয়ে দিচ্ছে? আমাদেরকে একটা মিথ্যা-অসত্য-অসাড়-মানবিক মূল্যবোধহীন-বিবেকবুদ্ধিহীন একটা সময়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? সত্য জানতে কি ভুলে গেছি আমরা? অথবা সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে প্রমাণ করার যে অপচেষ্টা চলছে তাতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছি আমরা?  মিথ্যা-অপ্রয়োজনীয়-কাল্পনিক ‘সত্য’ নির্মাণের রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছি সারাক্ষণ? কোনও একটা ছবি বা লেখা ফেসবুকে এলেই তা ‘সত্য’ কিংবা ‘মিথ্যা’ হয়ে যায়? ‘সত্য’ কি এতটাই সহজ? আমরা আদৌ ‘সত্য’ কি জানতে চাই আসলে? আমাদের হাতে কি সেই সময় এবং ভাবনার পরিসর আছে? খোদ মার্কিন মুল্লুকের নির্বাচন প্রচারণা কৌশলে এফবিআই প্রধান কিংবা পুতিনের সংশ্লিষ্টতার খবর  কিংবা নাসিরনগরের মন্দিরে হামলা কিংবা পরবর্তীতে মন্ত্রী ছায়েদুল হকের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ- এসবই কি আমাদের ‘ডিজিটালাইজড মনোজগৎ’কে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না?
ডিজিটাল যুগে এসে আমরা তো কেবল ডিজিটালাইজড মনোজগৎ নিয়ে বেড়ে উঠছি, যেখানে মনকে জগতের সঙ্গে যুক্ত করছিনা, করছি যন্ত্রের সঙ্গে! ফলে আমাদের চিন্তা-ভাবনায় এসেছে অস্থিরতা এবং অসারতা, ভাবনার দুয়ার প্রসারিত হয় কেবল ডিজিটাল দুনিয়ায়, দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয় সাইবার জানালা দিয়ে, ঘরের দরজা-জানালা দিয়ে নয়! তাই কোনও কিছুতেই নেই যেন আমাদের ভাবনার গভীরতা, নেই মানবিকতা বোধ, নেই চিন্তার সময়! এই অস্থিরতা কেবল আমাদের বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্ব জুড়েই! তাইতো- যে ট্রাম্পকে ভোগবিলাসী ধনকুবের আর নারী লিপসু বলে চিনতেন মার্কিনিরা, সেই কিনা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মঞ্চে দাপুটে হিলারিকে টক্কর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত! ডিজিটাল যুগে এসে নির্বাচনি প্রচারণা যতটা বাস্তবের মাঠে, তার চেয়ে বেশি সাইবার স্পেসে। তাই সাইবার স্পেস এখন আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সাইবার স্পেসের তথ্যকে আমরা কতটা এবং কিভাবে গ্রহণ কিংবা বর্জন করবো, তা আমাদেরই ভাবতে হবে। কেন বলছি, তা একটু স্পষ্ট করি:
এক. ফেসবুকের একটি ছবিকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত আমরা একসাথে ১৫ টি মন্দির জ্বালিয়ে দিয়ে আসতে পারি, আল্লাহ’র সৃষ্টি মানুষ পুড়িয়ে ফেলতে পারি কিন্তু একজন ৫০ বছর বয়সী মুসলমান পুরুষ ‘বড় আব্বা’ যখন ৫ বছরের হিন্দু শিশু পূজার প্রজনন অঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে ধর্ষণ করে, সিগারেটের ছেঁকা দিয়ে, সারা দেহে নানাভাবে ছিন্ন-ভিন্ন করে একটা নেকড়ে বাঘের মতো, তখন এই উত্তেজিত আমরাই আবার অনায়াসে নিশ্চুপও থাকতে পারি! আমাদের এই ‘সচেতন বিপ্লবী স্বর’ ‘ধর্মের রাজনীতি’ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও তা যদিও লিঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়, তা আমাদের আর ভাবায় না। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া এই দুটো ঘটনার মাঝে কোনটা আসলে ‘সত্য’? আমার কাছে এটাই বড় সত্য যে, ৫ বছরের শিশু পূজাকে সারারাত ধরে ফেনসিডিল খেতে খেতে একটা নরপশু ধর্ষণ করে ছিন্ন-ভিন্ন করে মেরে ফেলতে চেয়েছে। কিন্তু কী অদ্ভুত জাতি আমরা! এই সত্যকে আড়াল কিংবা অবজ্ঞা করে নেমে পড়েছি ফেসবুকে দেখা-অদেখা, সত্য-মিথ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ধোঁয়াশা-আবছায়া এক ছবি নিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়! কী বীভৎস আমাদের মন-মানসিকতা হয়ে উঠেছে! জয় যোগাযোগ মাধ্যমের, জয় মিথ্যার! আমাদের চৈতন্যবোধের এত অধঃপতন হয়েছে? হেরে গেলো সত্য, চাপা পড়ে গেলো ‘পূজার আর্তনাদ, সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির ভিড়ে।
দুই. আরেকটি প্রশ্ন অনেকেই ফেসবুকে করছেন, মন্ত্রী ছায়েদুল হক কি আসলেই ‘মালাউনের বাচ্চা’ বলেছেন? অনেকেই তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। কেউ কেউ আবার বলেছেন, তিনি যে অশ্লিল শব্দটা করেছেন তার প্রমাণ কী? সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে কেউ যদি এভাবে বলে থাকেন, তাহলে তিনি জঘন্য অপরাধ করেছেন এটা যেমন সত্য, তেমনি যদি তিনি এই ধরনের কিছু না বলে থাকেন, তাহলে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করাটাও কতটা যুক্তিযুক্ত হবে, তা আমাদের ভাবতে হবে। এই বিষয়টি কতটা সত্য আর কতটা ‘নির্মিত’ তা দেখার দায়িত্ব কিন্তু আমাদের সবার।

একজন মন্ত্রী কেবল মন্ত্রী নন, তিনি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন কর্তা ব্যক্তি, যিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনাকেই উদ্বুদ্ধ করার শপথ নিয়েছেন তার নানা কাজে ও কর্মের মধ্য দিয়ে। তিনি এমন কিছু বলতে পারেন না যা সাম্প্রদায়িকতাকে আরও উস্কে দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি আসলে সেদিন ভাষণে কী বলেছেন?

সত্য এটাও হতে পারে যে,  তিনি এইধরনের কথা বলেছেন। কিন্তু তার প্রমাণ তো লাগবে, সেটা কোথায়? ‘মালাউনের বাচ্চা’ বলেছেন কিনা, তার প্রমাণ কিভাবে পাওয়া যেতে পারে, সেটা কি আমরা কখনও ভেবেছি? ভিডিও-অডিও নেই বলে প্রমাণও পাওয়া যাবে না, তাতো হয় না। যে যুগে ভিডিও-অডিও ছিল না, সেই যুগে কি এইধরনের কথা-বার্তার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি? এখনও কি খুন-ধর্ষণ-অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিচার হচ্ছে না অডিও-ভিডিও ভিত্তিক প্রমাণ ছাড়া? কী ভয়ানক সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা। কোনও কিছু প্রমাণ করতেও আমাদের প্রযুক্তি অডিও-ভিডিওর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

কেউ কিছু বললে তা সত্য/মিথ্যা যাচাই বাছাই করার আর কোনও উপায় আমাদের হাতে নেই? আর নেই বলে হঠাৎ কেউ একটা কিছু বললো বা ভুয়া ছবি দেখালো, আর তা নিয়ে মন্দিরে হামলা করবো? এতো ‘চিল কানে নিয়ে গেছে’ জগতে আবার ঢুকে পড়েছি আমরা! আমাদের নিজস্ব সকল বিচার-বুদ্ধি এতটা কমে যাচ্ছে কেন, একবারের জন্যও কি ভেবে দেখেছি? যাচাই-বাছাই এর জন্য এখন প্রযুক্তিই একমাত্র ভরসা?

‘মালাউনের বাচ্চা’ বলেছেন, এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই তার পদত্যাগের জন্য জোরালো দাবি করতে হবে। কিন্তু আমার শংকা হলো,  যদি এই ধরনের কিছু না বলার পরও পদত্যাগ করতে হয় তাকে, তাহলে কিন্তু ‘ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র’ জয়ী হয়ে যাবে। এইক্ষেত্রে  রাজনীতির খেলাটা এতটা সহজ করে দেখার অবকাশ নেই! তাকে নিয়ে পদত্যাগের এই স্লোগানের ভিড়ে মূল আসামিরা পালিয়ে যাচ্ছে কিনা, তা কিন্তু কেউ ভাবছিনা। এক্ষেত্রে মূল আসামিরা শক্তিশালী এবং খুব নগ্নভাবে ‘ধর্মের রাজনীতি’ করছেন, এটাও আমাদের বুঝতে হবে। গণমাধ্যমের কল্যাণে জানতে পারলাম, স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজনই এই নগ্ন খেলায় জড়িত।

যে মুহূর্তে সারাদেশে আওয়ামী লীগ নিজেদের সুসংহত করতে যাচ্ছিল তৃণমুল হতে কেন্দ্র পর্যন্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে দলের একটি অংশের এই ধরনের সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে কী ধরনের হীন স্বার্থ জড়িত, তা খুব সুক্ষ্মভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। আজকে যদি এই ঘটনার আদ্যোপান্তো না জানা যায়, সামনের দিনগুলোতে নির্বাচন, মনোনয়ন, এবং নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে আরও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করবে ষড়যন্ত্রকারীরা। মনে রাখতে হবে,  ‘ধর্মের রাজনীতি’ এতটাই ভয়ানক এবং সংক্রামক ব্যাধি যে, ভবিষ্যতে এই ধরনের ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তি হলে সারাদেশ জুড়ে তা ছড়িয়ে পড়বে এবং তার ফায়দা লুটবে কেবলমাত্র ষড়যন্ত্রকারীরা।

অতএব নাসিরনগর নামক এই পুকুরের জল ঘোলা করা হয়েছে ‘ধর্মের রাজনীতি’ এবং ‘দলীয় রাজনীতির’ সংমিশ্রণে। ঘোলা এই জলে কে কাকে শিকার করতে চাইছে, তার পেছনের রাজনীতি আমাদের বুঝতে হবে। পুরো ঘটনার ভেতরেই পারস্পরিক সংযুক্ততা-বিযুক্ততা-ক্ষমতার লড়াই-নেতৃত্ব-মন্ত্রিত্ব- হাইব্রিডিটি-টেন্ডারবাজিসহ আরও অনেক কিছুই জড়িত! সেই সম্পর্কগুলোকে তদন্তের মধ্য দিয়ে বের করে নিয়ে আসতে হবে।

আবার অন্যদিকে এটাও অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, মন্ত্রী ছায়েদুল হক কেন দুইদিন সময় নিয়ে মুখ খুললেন? তিনিওবা সঙ্গে সঙ্গে এই দাবি করেননি কেন যে, তিনি এমনটি বলেননি? তবে কি তিনিও অডিও-ভিডিওর অপেক্ষায় ছিলেন? হতে পারে বয়সের কারণে রাজনিতির চাল তিনি বুঝতে পারছিলেন না।  হতে পারে আরও অনেক কিছুই। তবে ফেসবুকে কেউ কেউ তার আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করছেন, তাদের প্রতি প্রশ্ন, এই আমরাই আবার তৃণমূল হতে নেতৃত্ব উঠে আসে না কেন, তা নিয়ে সমালোচনা করি না? ভাষার শুদ্ধতা- অশুদ্ধতা দিয়ে নয়, বরং ব্যক্তি মানুষের জ্ঞান-প্রজ্ঞা-বিনয়- ব্যক্তিত্ব-ভদ্রতা-সততা- একাগ্রতা-নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা-এসব মিলিয়েই একজন নেতা। সেসব মাপকাঠিতে তাকে বিবেচনা করাই উত্তম হবে। সেই বিবেচনায় তার অবস্থান কোথায়, তাও দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

সবশেষে বলবো, যখন অডিও-ভিডিওর যুগ ছিল না, তখন কিভাবে এই ধরনের ইস্যুতে প্রমাণ মিলতো তা নিয়ে ভাবার দরকার। এই নিয়ে একটা নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা উপস্থিত জনতা কিংবা নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে একটি রিপোর্ট দেবেন যে, মন্ত্রী আসলে সেদিন ভাষণে কী বলেছিলেন? তাহলে হয়তো কিছুটা সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের পথ পাওয়া যেতে পারে।

পূর্বে প্রকাশিত logo_bati

Sharing