আমরা বসবাস করছি ডিজিটাল যুগে, তাই শুভেচ্ছা-শ্রদ্ধা-ভালোবাসা সবই এখন আর বাস্তবে নেই, সব ভার্চুয়াল জগতে চলে গেছে! আমরা এখন সব দিবসকেই একই কাতারে ফেলে উৎসবের আয়োজন করি! ফলে এবার দেখলাম, অনেকেই আমরা একুশে ফেব্রুয়ারির শোকের দিনটিতে মাথায় ফাল্গুনি সাজের ফুলঝুরি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, ছবি তুলে দিন শেষে ছবি পোস্ট করছি! কোনটা উৎসবমুখর দিন, কোনটা শোকাবহ দিন—এই তফাৎটুকুই যদি আমরা হারিয়ে ফেলি, তাহলে জিপিএ ফাইভ প্রজন্মের ওপর খামাখা দোষ চাপানোর অর্থ কী? সমস্যা হচ্ছে, একুশের চেতনা আমরা মেধায়-মননে ধারণ করি না, জানি না রফিক-জব্বার-সালামদের কেন সেদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে ১৪৪ ধারা অমান্য করার অজুহাতে গুলি করা হয়েছিল! শোকাবহ এ ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র বাংলায় (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, তার সঙ্গে আজকের আমাদের আর যুক্ততা কোথায় কিংবা কেউ কেউ বলতে পারেন, দরকারই বা কী!
ঠিক তেমনি নারী দিবসটির পরিণতিও একইরকম ঠেকছে। অন্য কোনও বিশেষ (ভ্যালেন্টাইন্স ডে, ফ্রেন্ডশিপ ডে, ইত্যাদি ) একটি দিনের মতোই এই দিনটিও পালন করি যেন উৎসব মুখরতায় এবং ফেসবুক নির্ভর হয়েই। পরস্পরকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা বিনিময়, ছবি তোলা, সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া—এই যেন নারী দিবসের কার্যক্রম আমাদের।
বিষয়টা সহজ করি বলি, গত কয়েক বছর ধরে দেখছি, এই দিনে কেউ কেউ ফুল এনে স্ত্রী/বন্ধু/সহকর্মীকে দিয়ে আবার ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করে জানান দিচ্ছেন, তিনি খুব জেন্ডার সংবেদনশীল! আবার স্ত্রী/বন্ধু/সহকর্মীও তা পেয়ে আহ্লাদে গদ গদ হয়ে ফেসবুকে জানান দিচ্ছেন, তার স্বামী/বন্ধু/সহকর্মী কত দায়িত্বশীল, কত ভালোবাসেন, নারী হিসেবে শ্রদ্ধা করেন, ইত্যাদি!
ইদানিং করপোরেট অফিসগুলোতে শুরু হয়েছে এক নতুন ফ্যাশন। অফিসে পুরুষ কলিগরা ফুল আর কেক হাতে নিয়ে নারী সহকর্মীদের গিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, সঙ্গে-সঙ্গেই উভয় পক্ষ থেকে ছবি চলে এলো ফেসবুকে। বিষয়গুলো ভালো এবং অবশ্যই ইতিবাচক, সন্দেহ নেই। কিন্তু তা যেন কেবল একটা দিন, একটা ছবি, একটা ‘লোক দেখানো’ সংস্কৃতিতে পরিণত না হয়। ফেসবুকে ছবির হিড়িক পড়াটা দোষের কিছু নয়, কিংবা বছরের একটা দিন নারীর জন্য আলাদাভাবে একটু আয়োজন করা, তাও দোষের কিছু নয়। কিন্তু বিপত্তিটা হলো, যখন পুরুষরা তো বটেই, খোদ নারীরাও পুঁজিবাদী সমাজের তৈরি নানান দিনের সঙ্গে আজকের এই দিনটির যে একটা বড় রকমের তফাৎ আছে, তা ভুলে কেবল একটি উৎসব ভেবেই উদযাপন করেন। দিনটির বিশেষত্বটা কী, তা জানাই আজ বড় বেশি দরকার।
এই দিবসটি যে একটি চেতনার, একটি লড়াইয়ের, একটি প্রতিজ্ঞার, একটি সিদ্ধান্তের—সেটা ভুলে যাওয়া মোটেই ঠিক হবে না। কেননা এখনও বাংলাদেশের ঘরে ঘরে নারীরা নির্যাতিত, অবহেলিত হচ্ছে। এখনও রাস্তায় পাওয়া যায় তনু-আফসানা-ইয়াসমিন-সাথির লাশ। এখনও প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হলে কুপিয়ে জখম করে প্রতিশোধ নেওয়া হয় নারীর ওপর। তাই এই দিবস কেবল উৎসব আর শুভেচ্ছার নয়, বরং সহিংসতা-নির্মমতা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ারও।
এই দিবসটি পালনের পেছনে কিছু কারণ আছে, কিছু বক্তব্য আছে, কিছু সিদ্ধান্ত আছে এবং একইসঙ্গে কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন, যেখানে ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন। সেই সম্মেলনে জার্মানির রাজনীতিবিদ ক্লারা জেটকিন, যিনি জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন, প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। তার এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে সিদ্বান্ত হয়, ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সমঅধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। তাই সমঅধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করাই এখন নারীদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত, ফেসবুক নির্ভরতা নয়।
এই দিবসে কেবল শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যদিয়েই রাষ্ট্র-সমাজ কিংবা পরিবার তার দায়িত্ব বা কর্তব্য শেষ করতে পারে না, বরং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ নিষিদ্ধ করতে হবে, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সংকল্পবদ্ধ হতে হবে, পুরুষতান্ত্রিক মন মানসিকতা পাল্টাতে হবে। অনেক পুরুষ মনে মনে ভাবতে পারেন, তিনি তো নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করেন না, অতএব তার কোনও দায়িত্ব নেই। অনেক নারী ভাবতে পারেন, আমি পুরুষের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছি না, অতএব আমারও কোনও দায়িত্ব নেই। কিন্তু বিষয়টা কেবল ‘আমি’তে আবদ্ধ থাকলে, তা হবে চরম স্বার্থপরের মতো ভাবনা। এই দিবসটির তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে আমাদের ‘নিজে’র পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নয়, সামগ্রিকতার আলোকে।
এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ‘নারী’র জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং তার পথ চলায় কী ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণের মধ্যদিয়ে ‘নারী’র ইমেজ নির্মাণ করা হয়, তা একটু দেখলেই বুঝব, আমরা কী অসম সমাজ ব্যবস্থায় দিনাতিপাত করছি। আবারও বলছি, এই ‘আমরা’ কেবল শহরের মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত নারী নয়, সেখানে আছে শহরের বস্তিতে বসবাসরত নারীর আর্তনাদ কিংবা গ্রাম বাংলার নারীর জীবন, যারা আসলে নিজের জন্য জন্মই নেইনি, যাদের প্রতিনিয়ত শারীরিক- মানসিকভাবে নির্যাতিত হতে হয় ঘরের ভেতর-বাইরে। তবে এটাই সত্য যে, নারী নির্যাতন কোনও বিত্তের মাঝে আবদ্ধ নয়। ধনী-গরিব নির্বিশেষে ‘নারী’কে অবদমনের জন্য সব আয়োজন সমাজ নিজেই তৈরি করে! একটু ব্যাখ্যা করি বিষয়টি।
একুশ শতকের এই ডিজিটাল দুনিয়ার এই আধুনিকতম দিনে এসে শহর কিংবা গ্রামে এখন আর নারীর ইমেজ তৈরির প্রক্রিয়া মেয়ে শিশুটির জন্মক্ষণ হতে শুরু হয় না, বরং আলট্রাসনোর মাধ্যমে যেদিন জানা গেল মায়ের গর্ভে বেড়ে উঠছে একটি মেয়ে শিশু, তখন থেকেই তার ইমেজ নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়! যেই মাত্র জানা গেল, মায়ের গর্ভের সন্তানটি মেয়েশিশু, মায়ের যদি এরেআগের সন্তান ছেলে শিশু থেকে থাকে, তাহলে কিছুটা রেহাই পায় মা, নয়তো ভাটা পড়তে শুরু করে মায়ের যত্নে-সেবায়! কিন্তু তা যদি হয় দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সন্তান এবং প্রথম সন্তানও মেয়ে সন্তান, তাহলে তো কথাই নেই, সামাজিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই চলে তার ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতন। কোনওভাবেই ধরে নেওয়া যাবে না যে, শ্রেণিভেদে এই চিত্রের ধরন-ধারণ ভিন্ন হবে। আমার আমেরিকায় চার বছর থাকার যে অভিজ্ঞতা, তা থেকে এই বিষয়টি খুব স্পষ্ট যে, ছেলেসন্তানের আসার বার্তা মেয়েসন্তানের চেয়ে হাজার গুণ আনন্দের বন্যা বয়ে নিয়ে আসে পরিবারে। হোয়াইট আমেরিকান মা’দেরই দেখেছি কি গর্বিত দৃষ্টি, ছেলে সন্তান এর আগমন বার্তা শুনে! যে কারণেই তারা হিলারিকে ভোট না দিয়ে ট্রাম্পের মতো দাম্ভিক, অসহিষ্ণু এবং অহঙ্কারী আগাগোড়া একজন ব্যবসায়ীকে বানিয়েছে প্রেসিডেন্ট!
কিছুদিন আগে আমেরিকায় থাকা আমার এক প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তার দুই মেয়ে, নিজে ইঞ্জিনিয়ার, ছোটবেলাতেই চলে গিয়েছিলেন সেখানে, বেশ বড় চাকরি করছেন, নিজের একটা ফার্মও দিয়ে ফেলেছেন! তার মা প্রায়শই তাকে বলছেন, আরেকটি সন্তান নেওয়ার জন্য, এবার নাকি ছেলেই হবে! একজন ইঞ্জিনিয়ার মায়ের দুই সন্তান থাকার পরও তার মায়ের চোখে মেয়েটির জন্ম এখনও সার্থক মনে হচ্ছে না, কেবল একটা ছেলে সন্তান নেই বলে!—অনেকেই এই গল্প শুনে লাফিয়ে উঠবেন, এই দেখুন, মেয়ের মা তো একজন নারীই, কোনও পুরুষ তো নয়! তারপরও আপনারা পুরুষকেই দোষ দেন! কিন্তু এখানেই ভুল হয়ে যাচ্ছে! বিষয়টি পুরুষ বা নারীর নয়, বিষয়টি সমাজ-সংস্কৃতির, মূল্যবোধ-চিন্তা-চেতনার। দোষটা একজন মা বা শাশুড়ির নয়, বিষয়টি হাজার বছর ধরে চর্চা হয়ে আসা পুরুষতান্ত্রিক মনমানসিকতার প্রভাব।
আমেরিকায় ত্রিশ বছর ধরে থাকা এই মা আসলে পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শে বেড়ে ওঠা এক নারী শরীর, যিনি এবং যার মন প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রিত হয়, তার চারপাশের পরিবেশ দ্বারা। এই মা তার নিজের জীবন এবং চারপাশের আত্মীয়স্বজনের জীবন অভিজ্ঞতা হতে শিখেছে ও জেনেছে যে, একজন মায়ের ‘ছেলে সন্তান’ না থাকলে সেই মা যত বড়ই আর যত শিক্ষিত হোক, লাভ নেই! সমাজে তার ‘দরদাম’ নির্ধারিত হয় ছেলে সন্তানের মা হলেই! আমি যতদুর জানি, এই মায়ের তৃতীয় সন্তানটি ছেলে এবং ছেলেটি হয়েছিল তাদের দুই বোনের জন্মের ৮ বছর পর। অতএব এই আট বছর ওই মাকে হয়তো এত কথা শুনতে হয়েছে যে, তিনি এখনও সেই কথা ভুলতে পারেননি। এখনও তাকে সেসব কথা তাড়িয়ে বেড়ায়। ছেলে সন্তান না হওয়ার ভয়, অনিশ্চয়তা তাকে এতটাই ভীত করেছিল যে, এখনও তার মেয়ের ‘ছেলে সন্তান’ নেই বলে একইরকম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
হয়তো এসব উচ্চবিত্ত পরিবারে হবু মায়ের যত্ন-আত্তির কোনও কমতি হয় না, হয়তো সরাসরি কোনও বাক্যও শুনতে হয় না, কিন্তু চারপাশের ফিসফাস এবং পারিপাশ্বিকতা এমন এক আবহ তৈরি করে যে, একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়েই একজন নারীকে লেবার রুমে মেয়েশিশুটিকে প্রসব করতে হয় এবং শেষ জীবন পর্যন্ত ছেলে সন্তান নেই বলে একধরনের অসহায়ত্ব নিয়েই বেঁচে থাকেন। এই দীর্ঘশ্বাস আমাদের কবে বন্ধ হবে? এই যদি হয় আমেরিকায় ত্রিশ বছর বসবাস করা কিংবা শহুরে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত পরিবারের অবস্থা, তাহলে গ্রাম-গঞ্জের অবস্থা কী?—একবার ভেবে দেখা দরকার।
সেই যে আগমনী বার্তা হতে শুরু হয় মেয়েশিশুটির প্রতি একধরনের অবজ্ঞা, সেই অবজ্ঞা আর অবহেলার মাঝেই বেড়ে ওঠে নারী এবং আমৃত্য এই বৈষম্যমূলক আচরণের ভেতর দিয়েই তার পথ চলা। শ্রেণিভেদে নারীর বেড়ে ওঠার পরিবেশ ভিন্ন হলেও মতাদর্শের দিক হতে নারী অবহেলিতই থেকে যায়। আমেরিকা হতে শুরু করে বাংলার কোনও অচিনপুরের মেয়েশিশু মানেই হলো: গোলাপি রঙের জামা-কাপড় পরিধান করানো, হাতে পুতুল আর রান্না-বান্নার খেলার সামগ্রী তুলে দেওয়া, নরম-ভদ্র, বিনয়ী করে তোলা, ‘সাত চড়ে রা নেই’ টাইপ করে গড়ে তোলা, কিশোরী হলে তাকে স্বপ্ন দেখানো একটি ভালো বিয়ের, তার জীবনের লক্ষ্য স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে শান্তিতে ঘর-সংসার করা—সকল মেয়েলিপনার ভেতর দিয়ে যেন সমাজের একটি পুতুল বানানোর প্রক্রিয়া চলে! এই প্রক্রিয়ার মাঝে থাকে না কোনও বড় স্বপ্ন, থাকে না কোনও লক্ষ্য, থাকে না নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়।
বরং এই প্রক্রিয়ায় থাকে অনেক ‘না’ , যেমন: মেয়েরা এভাবে বসে না, এভাবে দাঁড়ায় না, চোখ তুলে কথা বলতে নেই, মেয়েরা উচ্চস্বরে কথা বলে না, মেয়েরা প্যান্ট-শার্ট পরে না, মেয়েদের তর্ক করতে নেই, বিকালে ভাইয়ার সঙ্গে বাইরে খেলতে নেই—এ রকম আরও কত ‘না’-এর মাঝেই ‘নারী’র বেড়ে ওঠা! পরিবার ও সমাজ দ্বারা নির্ধারিত লিঙ্গীয় পরিচয় আর লিঙ্গীয় ভুমিকা যেন তাকে দিনে দিনে শোকেজে রাখা পুতুল বানানোর চেষ্টায় রত থাকে।
প্রতিমুহূর্তে তাকে স্বরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, তার ভাই কিংবা পরিবারের কোনও ছেলে সদস্যের চেয়ে সে ভিন্ন, যেখানে তার ভাই ভোগবিলাসে গা ভাসিয়ে দেবে, সেখানে তাকে হতে হবে সেক্রিফাইস মনমানসিকতার এবং ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে কৈশোরে ভাইকে, বিয়ের পর স্বামীকে সেবা দিয়ে নিজের জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে নেবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেড়ে ওঠা বাবা-মা’ই কিন্তু ভাই-বোনের এই ভিন্নতাকে প্রকট করে তোলেন। এই ভিন্নতা তাকে সরিয়ে দেয় তার সহজাত সকল চারিত্র্যিক বিশিষ্টতা থেকে।
পরিবারের ভাইটি যখন বাইরে যাচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে বাইরের মুক্ত বায়ুর স্বাদ নেওয়ার স্বাধীনতা, তখন অন্যদিকে মেয়েটি কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, কিভাবে গৃহ-পরিবেশে অবরুদ্ধ থেকে অধীনতার মাঝে কাজ করতে হয়! কাজ লোও খুব ছাঁচে বাঁধা আটপৌরে ধরনের যেন নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়! পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শের আষ্টে-পৃষ্টে বাঁধা পুঁজিবাদী সমাজই নির্ধারণ করে দেয় এই প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের সংজ্ঞা, যা কেবল অর্থনৈতিক আয়ের সঙ্গে যুক্ত। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তার নিজস্ব মতাদর্শ, আচার-প্রথা, চিন্তা-চেতনা ও প্রতিদিনকার পারিবারিক চর্চা দ্বারা কী করে নারীকে তার মেয়েবেলা হতেই অর্থনৈতিক আয় হতে বিযুক্ত কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত করে তোলে এবং একই সঙ্গে ছেলেটিকে বহির্মুখী কাজ বা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে, সেই রাজনীতিটাও এখন অনুধাবন করা জরুরি।
এত গেল ঘরের পরিবেশের কথা, যেখানে ‘কোমল’, ‘লাজুক’, ‘বিনয়ী’, ‘ভীতু’, সেক্রিফাইসিং, অন্তর্মুখী, মোট কথা ‘সাত চড়ে রা নেই’ ধাঁচের নারী তৈরি করা হয়।
এবার দেখি, এই অবদমিত পরিবেশ হতেও যখন একজন নারী নিজের পায়ে দাঁড়াতে, ‘তিনিও মানুষ, তারও নিজস্ব একটা পরিচয় আছে’ এই পরিচিতি তৈরির জন্য বের হয়ে কাজ করতে শুরু করে, তার বা তাদের প্রতি এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
নারী যেই মাত্র ঘর থেকে ‘বাহিরমুখী’ হলো, সেই মুহূর্ত হতে শুরু হয়ে যায়, তার প্রতি বহুমাত্রিক নির্যাতন। যেমন: নারী বাইরে কাজ করলেও মূলত তিনি ঘরের কাজের জন্যই, অতএব যত কাজেই করুক, ঘরে ফিরে তাকে রান্না ঘর, বাচ্চা সামলানো, স্বামীর খাবার তৈরি থেকে শুরু করে সব কাজই করতে হবে। বাইরের কাজে বা কর্ম ক্ষেত্রে তিনি সফল হতে হলে পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ মাত্রায় পরীক্ষা দিয়ে তাকে বোঝাতে হয়, তিনি সফল নারী। আর সফল না হতে পারলে তিনি ‘নারী’, তাই ‘নারীত্ব’কেই দোষারোপ করা হয়| পারিবারিক কাজে সফল হতে গেলে কর্মক্ষেত্রে তার একটু প্রভাব পড়লেই অভিযোগ উঠে, তৈরি হয় নানা ডিসকোর্স: নারীরা হলো ‘ফাঁকিবাজ’, ‘অলস’, ‘কাজ করতে পারে না’, ইত্যাদি| অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে ‘সফল’ হতে গেলে ‘পারিবারিক’ মানুষজনের ডিসকোর্স হয়ে উঠে এমন: ‘নারীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ঘর, তা না সামলে ঘরের বউ গেছে নাম কুড়াতে’, ‘ সন্তান মানুষ হবে কিভাবে মা সারাদিন বাইরে কাজ করলে?’, ‘ ঘরে কাজ না করে বউ গেছে সমাজ উদ্ধার করতে’, ইত্যাদি, ইত্যাদি। ফলে নারীর জন্য দু’টি ক্ষেত্রই হয়ে ওঠে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের! ফলে দুটো ক্ষেত্রেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে নারীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এই চাপ বোঝার জন্য আমাদের সমাজ কবে তৈরি হবে? অথচ বিপরীতে পুরুষ ব্যক্তির কর্মক্ষেত্রে ‘সফল’ হোক বা না হোক, তার সঙ্গে পারিবারিক কাজের বা দায়িত্বের কোনও সম্পর্কই তৈরি হয় না|
দিন যায়, সপ্তাহ যায়, বছর যায়, অথচ ঘরের নারীটিকে একবারের জন্য আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ধন্যবাদ’ বলতেও স্বামী কিংবা সন্তান হিসেবে আমাদের বাধে! ধরেই নেই, স্ত্রী বা মা হচ্ছে বাসার ‘ স্থায়ী কাজের লোক’, যার কাজ আমাদের ঘরের সব কাজ করে দেওয়া, আমাদের সবার সব রকম আবদার পূর্ণ করা। আমরা সন্তানেরাও মায়ের আদরকে ব্যবহার করছি নিজের স্বার্থে, মায়ের স্বার্থ দেখার সময় কোথায়? আমরা যারা অফিসে সহকর্মী কিংবা নারী বন্ধুকে নারী দিবসে শুভেচ্ছা জানাই, তাদের ক’জন নারী দিবসে মা’কে ধন্যবাদ জানাই, যিনি সমাজের সব বাধা অতিক্রম করে আমাদের আজ এতটা দূর নিয়ে এসেছেন, প্রতিদিন বৈচিত্র্যহীন জীবন যাপন করে, বদ্ধ চার দেয়ালের কিচেনে বন্দি হয়ে রান্না করে খাওয়াচ্ছেন। কজন সন্তান মা’দের ‘স্যরি’ বলি এই দিনে যে, তাদের জীবনে সমঅধিকার এর সাধ দিতে পারিনি বলে, বাবার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মা’কে রক্ষা করতে পারিনি বলে। ক’জন স্বামী তার স্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে জানায়, ‘আজ থেকে আমিও আছি তোমার পাশে ঘরের সকল কাজে’? আজকের দিন হোক উপলব্ধির, শপথের, কেবল শুভেচ্ছার নয়!
নারী দিবসে এই লিঙ্গীয় বৈষম্যমূলক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিটি নাগরিককে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে। ভাবতে হবে, সমস্যার সমাধান কিভাবে সম্ভব? সমস্যার মূলে গিয়ে কাজ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।
তাই নারী দিবস হোক উপলব্ধির, শপথের, প্রতিজ্ঞার, কেবল শুভেচ্ছার নয়! এই প্রতিজ্ঞা নারী-পুরুষ উভয়কেই নিতে হবে। নারীর সমঅধিকার আদায়ে নারী-পুরুষ উভয়েরই রয়েছে গুরুদায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের শুভ সূচনা আজ থেকেই হোক!

শুভ হোক বিশ্ব নারী দিবস!

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা

 

logo_bati

Sharing